৫ আগস্ট, ২০২৬। সকাল থেকেই ঢাকার শেরেবাংলা নগরে ভিড় জমতে শুরু করে। যে ফটক দিয়ে দুই বছর আগে হাজারো মানুষ ক্ষোভে ভবন ভেঙে ছে, সেই একই ফটকের সামনে এবার দাঁড়িয়ে আছেন জুলাই যোদ্ধারা। টিকিট হাতে নয়, প্রতীক্ষায়। বেলা দুইটা পনেরো মিনিটে প্রবেশের কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে ফটক খোলে নাই। তারপর নামল প্রবল বৃষ্টি। বিকেল চারটার দিকে অপেক্ষমাণ জনতা স্লোগান দিয়ে মিছিল করে প্রায় জোর করেই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। যে ভবনে দুই দশকের কাছাকাছি সময় ধরে ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল, যে ভবনের সীমানাপ্রাচীর একদিন জনতার ঢল ভেঙে ফেলেছিল, সেই গণভবন এখন জাদুঘর। উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন, এই জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ফ্যাসিবাদের মুখোশ উন্মোচন করবে।
কিন্তু একই দিনে, শহরের অন্য প্রান্তে আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে, জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে আরেকটি লড়াই চলছিল। একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে হট্টগোল বাধে, জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা অনুষ্ঠান ছেড়ে বেরিয়ে যান, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নিজে ব্যথিত হয়েছেন বলে প্রকাশ করেন। একই দিনে, একই ইতিহাস নিয়ে, দুটি ভিন্ন আখ্যান, দুই রকম অনুভূতি। এই দ্বৈততাই বোধহয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের গল্পের প্রকৃত কেন্দ্র। এটি স্রেফ একটি জাদুঘরের কাহিনী না।
গণভবনের ইতিহাস আসলে বাংলাদেশের ক্ষমতার ইতিহাসের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। ১৯৭৩ সালে শেখ মুজিবুর রহমান শেরেবাংলা নগরে সংসদ ভবনের পাশে এই ভবন নির্মাণ করান, কারণ মিন্টো রোডের পুরনো প্রেসিডেন্ট ভবনে তাঁর দপ্তরের জন্য জায়গা যথেষ্ট হচ্ছিল না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর সামরিক শাসনামলে ভবনটি সামরিক আদালতে রূপান্তরিত হয়, পরে একাধিক সরকারি দপ্তরের ঠিকানা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৮৫-৮৬ সালে এরশাদ সরকার প্রথম দফা সংস্কার করে একে রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা ‘করতোয়া ভবন’ নাম দেয়, ১৯৮৮ সালে দ্বিতীয় দফা সংস্কারের পর এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পরিণত হয়। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা মাত্র এক টাকায় ভবনটি ইজারা নেওয়ার সিদ্ধান্ত সমালোচিত হলে তিনি নিজেই তা ত্যাগ করেন, পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেই ইজারা বাতিল করে। অবশেষে ২০০৯ সালে ‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন’ পাসের পর ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন হিসেবে বরাদ্দ হয়, এবং ২০১০ সালের ৫ মার্চ থেকে তিনি সেখানে বসবাস শুরু করেন। খালেদা জিয়া, জিয়াউর রহমান কিংবা এরশাদ, ক্ষমতায় থাকা অন্য কোনো সরকারপ্রধান কখনো এই ভবনে বাস করেননি। অর্থাৎ পৌনে তিন একরের এই স্থাপনা বাস্তবে এক নেতার সঙ্গেই যুক্ত হয়ে পড়েছিল, একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রতীক হয়ে।
৫ আগস্ট ২০২৪, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। সেদিনই হাজারো মানুষ গণভবনের সীমানা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন, ভাঙচুর ও লুটপাট চলে। পরদিন সেনাবাহিনী ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়। এই ধ্বংসস্তূপ আর বিজয়োল্লাসের মিশ্র স্মৃতি নিয়েই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হবে।
২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের পঞ্চম বৈঠকে গণভবনকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়। প্রশ্ন উঠেছিল, ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী তাহলে কোথায় থাকবেন। তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম তখন বলেছিলেন, সে সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হবে, আপাতত প্রধান উপদেষ্টা যমুনাতেই থাকবেন।
দুই মাসের মধ্যেই কাঠামো তৈরি শুরু হয়। ২ নভেম্বর ২০২৪, গণভবনের গেটে সংবাদ সম্মেলন করে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ১৭ সদস্যের একটি কমিটি ঘোষণা করেন। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় কিউরেটর, শিক্ষক, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা ড. এবাদুর রহমানকে। যুগ্ম-আহ্বায়কের দায়িত্ব পান প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম। কমিটিতে আরো ছিলেন লেখক ও মানবাধিকার কর্মী মুসতাইন বিল্লাহ; জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক জাহিদ সবুজ; জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক ড. নুরুল মোমেন ভূঁইয়া; আলোকচিত্রী, শিক্ষক ও শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক তানজিম ওয়াহাব; লেখক ও গবেষক সহুল আহমেদ মুন্না; স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম; বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক; আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক; প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক; স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি; গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী; স্থাপত্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান স্থপতি মো. আসিফুর রহমান ভূঁইয়া; ইন্সটিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশের সভাপতি বা উপযুক্ত প্রতিনিধি; নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের লিড আর্কিটেক্ট বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার এবং ডিজাইন ওয়ার্কস গ্রুপের স্থপতি তানজিম হাসান সেলিম।
মাহফুজ আলম সেদিন বলেন, ‘গত ১৬ বছরে এই গণভবন বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-যাতনার জায়গায় পরিণত হয়েছিল। আবার এই গণভবনে জনগণের বিজয়ের স্মৃতিচিহ্নও রয়েছে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের বিজয়ের চিহ্নও এই জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হবে।’

কাগজপত্রের সূত্র ধরে
জাদুঘরকে আইনি ভিত্তি দিতে সময় লেগেছিল এক বছরের বেশি। ১৩ নভেম্বর ২০২৫, অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। অধ্যাদেশের প্রস্তাবনায় বলা হয়, ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতীক হিসেবে সাবেক সরকার প্রধানের বাসভবনকে একটি স্বতন্ত্র জাদুঘরে রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল।
কিন্তু অধ্যাদেশ স্থায়ী আইন নয়। নির্বাচিত সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন ছিল। ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংশোধনীসহ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ পাস হয়। মাদারীপুর-৩ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আনিছুর রহমান তিনটি সংশোধনী প্রস্তাব করেছিলেন, তার একটি ছিল উল্লেখযোগ্য, জাদুঘর পর্ষদের সভাপতি পদে বাইরে থেকে মনোনীত কোনো বিশেষজ্ঞের বদলে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে বসানো হবে। ৯ জুলাই সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় আইন অনুযায়ী জাদুঘরের পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এ পর্ষদের সভাপতি হয়েছেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। জাদুঘরটির মহাপরিচালক সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
যে জাদুঘরের ধারণা জন্মেছিল একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ-নেতৃত্বাধীন পর্ষদ কল্পনা নিয়ে, সেই জাদুঘরের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত একটি নির্বাচিত সরকারের মন্ত্রণালয়ের হাতে চলে আসে। পাস হওয়া আইনটির নাম ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আইন, ২০২৬’ (২০২৬ সনের ৯০ নং আইন), যা পুরনো অধ্যাদেশটি রহিত করে দেয়।
নির্মাণের তদারকিতে যুক্ত ছিল দুটি প্রাতিষ্ঠানিক সত্তা, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। স্থাপত্য ও নকশার কাজে যুক্ত ছিলেন নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের বায়েজিদ মাহবুব খন্দকার এবং ডিজাইন ওয়ার্কস গ্রুপের তানজিম হাসান সেলিম, দুজনেই মূল কমিটির সদস্য হিসেবে শুরু থেকে যুক্ত ছিলেন।
জুলাই জাদুঘরের টিম লিডার ও আর্টিস্টিক ডিরেক্টর হিসেবে ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি বলেছেন, জুলাই জাদুঘর গড়ে তোলার কাজ ছিল ‘আক্ষরিক অর্থেই একটি যুদ্ধের মতো’। মন্ত্রণালয়ের শত শত কাজের মধ্যে মাত্র এক বছরের মধ্যে শূন্য থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ জাদুঘরের কাঠামো দাঁড় করানো ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি দায়িত্ব। ফারুকী জানান, সরকার শুরুতে আন্তর্জাতিক পরামর্শক (কনসালট্যান্ট) নিয়োগের চিন্তা করা হলেও দেখা যায় তাদের মাধ্যমে কাজ শেষ করতে তিন বছরের বেশি সময় লাগবে এবং এতে বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। পরে নিজেদের সক্ষমতা নিয়েই কাজ শুরু করা হয়।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের নির্মাণকাল আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের সময়কালও বটে। যে ব্যক্তিরা ২০২৪ সালে জাদুঘরের ধারণা প্রথম রূপ দিয়েছিলেন, যেমন নাহিদ ইসলাম বা মাহফুজ আলম, তাঁরা তখন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়, এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ততদিনে নাহিদ ইসলাম জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে ভিন্ন আসনে বসেছেন।
বিলম্ব, অর্থ এবং অভিযোগ
জাদুঘরের বাজেট নিয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যায় সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর ৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখের সংবাদ সম্মেলনে এবং তার আগে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের বিবৃতিতে। জাদুঘর মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাবের বরাত দিয়ে প্রথম আলো জানায়, নির্মাণে গণপূর্ত বিভাগ ও জাতীয় জাদুঘর মিলিয়ে মোট বরাদ্দ পেয়েছিল ১২৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, তার মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১১০ কোটি ৯২ লাখ টাকা, আর অব্যয়িত ১২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উনিশটি বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনায় বাষট্টিটি তথ্যচিত্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে পাঁচ কোটি ২৩ লাখ টাকা, আর ভাস্কর্য, গ্যালারি সজ্জা, প্রতীকী কবরস্থান ও আয়নাঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় পনেরো কোটি টাকা, যা প্রকল্পের পরিধি বিবেচনায় যৌক্তিক বলে দাবি করা হয়েছে। একটি টিনের ঘেরা নির্মাণে চৌষট্টি লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক হলে কর্তৃপক্ষ জানায়, এই অর্থ জাদুঘর কর্তৃপক্ষ নয়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বরাদ্দের অংশ, জাদুঘর কেবল প্রশাসনিক অনুমোদন দিয়েছিল।
জনবল নিয়োগ নিয়েও গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। একটি সিসিটিভি ফুটেজ ঘিরে দাবি ওঠে, গোপনে নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করে বলে, ওটি ছিল শহীদ পরিবার ও আহতদের কর্মসংস্থানে উৎসাহ দেওয়ার একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক, কোনো নিয়োগ পরীক্ষা নয়। একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অন্যত্র বদলি করা হয়। জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এই সব প্রচারকে ‘ভিত্তিহীন, অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছে ।
উদ্বোধনের ঠিক আগে, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করা হবে, প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হবে। যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলেছেন, জাদুঘর উদ্বোধন আশার কথা হলেও এত মানুষের রক্ত আর আবেগ জড়িত যে কাজে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা উচিত হয়নি, উদ্বোধনের পরে হলেও এই বিতর্কের স্বচ্ছ অবসান তাঁরা চান।
জাদুঘরের ভেতরে
গণভবনের ১৭ দশমিক ৬৮ একর জায়গার মধ্যে জাদুঘর প্রদর্শনীর জন্য পাঁচটি নতুন পথ তৈরি করা হয়েছে। প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকলে লাল ইটের পথ ধরে দর্শনার্থীরা প্রথমে দেখেন ফলের গাছে ঘেরা এক দীর্ঘ প্যানেল, নাম ‘গণতন্ত্রের পথে দীর্ঘ যাত্রা’, যেখানে স্বাধীনতা-পরবর্তী গণতন্ত্র আর স্বৈরাচারের দ্বন্দ্বমুখর সম্পর্কের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
মূল ভবনের সামনের বিশাল সবুজ মাঠের একাংশে গড়া হয়েছে সাদা মার্বেল দিয়ে ঘেরা বৃত্তাকার ‘জুলাই মেমোরিয়াল’। পাথরের গায়ে খোদাই করা আছে হাজার হাজার নাম, শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে নিহত প্রায় চার হাজার মানুষের স্মরণে। ভেতরের অংশ সবুজ ঘাসে ঢাকা সারি সারি প্রতীকী কবরের আদলে সাজানো, সংখ্যায় আড়াই হাজারের বেশি। মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে আন্দোলনের আলোড়ন তোলা ঘটনাভিত্তিক ভাস্কর্য, রিকশার ওপর গুলিবিদ্ধ লাশ, পুলিশের সাঁজোয়া যানে ঝুলে থাকা আন্দোলনকারীর দেহ, মিছিলে যাওয়া সাইকেল-আরোহী স্কুলছাত্রী, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, নারী যোদ্ধাদের অংশগ্রহণ, গুমের শিকার মানুষের পুকুরপাড়ে পড়ে থাকা দেহ, শাপলা চত্বরের সহিংসতা। মাঠের দক্ষিণ অংশে তৈরি হয়েছে কুখ্যাত গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর আদলে একটি প্রতীকী স্থাপনা।
মূল জাদুঘর ভবনটি শেখ হাসিনার দোতলা বাসভবন। নিচতলার একটি বড় কক্ষে মেঝের মাঝখানে বসানো আছে গ্লোব-আকৃতির টিভি স্থাপনা, যেখানে অবিরাম চলছে শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের কর্মকাণ্ডের ভিডিও। নিচতলাজুড়ে আছে গত দেড় দশকের নির্যাতন, গুম ও খুনের বিবরণ, শাপলা চত্বর ও পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নথি, গণভবন থেকে উদ্ধার হওয়া ক্রসফায়ার, বেআইনি প্লট বরাদ্দ ও আর্থিক দুর্নীতির প্রমাণ-সংবলিত কাগজপত্র, এবং শেখ হাসিনার ব্যবহৃত লাল টেলিফোন। যে ‘কল রুম’-এ তিনি বাহিনী প্রধানদের নিয়ে বৈঠক করতেন, সেই কক্ষের মূল মেঝে অক্ষত রাখতে পুরু কাচ দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে, যাতে জনরোষের চিহ্ন সংরক্ষিত থাকে, দর্শনার্থীরা সেই কাচের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারেন। অন্য কক্ষগুলোয় প্রদর্শিত হচ্ছে আয়নাঘরে ব্যবহৃত বলে দাবি করা নির্যাতনের যন্ত্রপাতি, চাবুক, বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার যন্ত্র, বৈদ্যুতিক চেয়ার।
দোতলা সাজানো হয়েছে জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। মহাপরিচালকের ভাষ্যে, অন্তত পাঁচশ শহীদের ব্যবহৃত সামগ্রী এখানে প্রদর্শিত, আরও অনেক সংগ্রহে আছে যা স্থানাভাবে দেখানো যাচ্ছে না। শেখ হাসিনার শোবার ঘরে, যে বিছানা একদিন বিক্ষুব্ধ জনতা ভেঙেছিল, সেখানে শহীদদের নাম লেখা আচ্ছাদনের ওপর বিছানো আছে শহীদ আবু ইসাহাকের রক্তমাখা শার্ট। একটি ‘ইমার্সিভ প্রজেক্ট’ কক্ষে ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত চার দেয়ালজুড়ে দশটি প্রজেক্টর থেকে ৩৬০ ডিগ্রি কোণে প্রদর্শিত হয় আন্দোলনের দৃশ্য, দর্শক মেঝেয় বসে দেখেন, যেন নিজেই সেই ঘটনার ভেতরে ঢুকে পড়েছেন। প্যাসেজজুড়ে আছে টাইমলাইন, সূচিকর্মে বোনা স্ক্রল, ডিজিটাল পোস্টার, শহীদদের বই-খাতা-খেলাধুলার সামগ্রী।

উদ্বোধনের প্রথম দিন সংরক্ষিত ছিল শুধু শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য। তাঁদেরই একজন, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কন্যা শামারুহ মির্জা, জাদুঘর দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানান, শেষ কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার সময় তাঁর চোখ ভিজে গিয়েছিল বলে লেখেন তিনি। এই ধরনের ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া বলে দেয়, যাঁদের পরিবার সরাসরি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের কাছে জাদুঘরটি নিছক প্রদর্শনী নয়, স্মৃতিচারণার এক শারীরিক জায়গা।
একই দিন সন্ধ্যায় আগারগাঁওয়ের অনুষ্ঠানে যা ঘটল, তা আরও গভীর একটি প্রশ্ন সামনে আনে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা’ অনুষ্ঠানে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শনীকে ঘিরে বিতণ্ডা বাধে। এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব মাহিন সরকার অভিযোগ করেন, তথ্যচিত্রে এক দফা ঘোষণার কৃতিত্ব দেখানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে, অথচ যিনি বাস্তবে নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করে এক দফা ঘোষণা করেছিলেন, সেই নাহিদ ইসলামের নাম তাতে নেই।
হট্টগোলের মধ্যে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন মঞ্চে উঠে মন্তব্য করেন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানেও ইতিহাসের সবকিছু ধারণ করতে ব্যর্থ হওয়া হলো, এবং সতর্ক করেন, বাংলাদেশে যেভাবে আওয়ামী লীগ একদা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস একপেশেভাবে দখল করেছিল, একই ধরনের পরিস্থিতি এখানেও তৈরি হচ্ছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজে সমালোচনা করেন, তথ্যচিত্রে শহীদ আবু সাঈদের ছবি না থাকাটা তাঁকে ব্যথিত করেছে, কারণ আবু সাঈদ ছাড়া জুলাই বিপ্লবের কোনো তথ্যচিত্র সম্পূর্ণ হতে পারে না, একই সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছবিও তাতে ছিল না বলে তিনি উল্লেখ করেন।(সূত্র) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে বলেন, জুলাই আন্দোলনকে দলীয়করণ করা যাবে না, কারণ প্রশ্ন উঠলে জুলাই শেষ পর্যন্ত কারো থাকবে না। এই ঘটনাটি জাদুঘরের ভেতরে ঘটেনি, ঘটেছে ভিন্ন একটি অনুষ্ঠানে, ভিন্ন একটি তথ্যচিত্র নিয়ে। কিন্তু একই দিনে ঘটা এই বিতর্ক জাদুঘরের কেন্দ্রীয় প্রশ্নটিকেই তীব্রভাবে সামনে আনে, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তৈরি যেকোনো স্মৃতি-আখ্যানে কার অবদান কতটা জায়গা পাবে, কে বাদ পড়বে, এবং কে ঠিক করবে কোন সংস্করণটি সরকারি সত্য হিসেবে গৃহীত হবে।
রাষ্ট্র-নির্মিত স্মৃতি-জাদুঘরের ইতিহাস নতুন নয়, এবং প্রতিটি দৃষ্টান্তই একই দ্বন্দ্বে ভুগেছে, স্মৃতিকে সততার সঙ্গে ধারণ করা, নাকি ক্ষমতার আখ্যান হিসেবে ব্যবহার করা। চিলিতে মিশেল বাশেলে সরকারের উদ্যোগে গড়া মিউজিও দে লা মেমোরিয়া ই লস দেরেচোস উমানোস পিনোশে-আমলের নিপীড়নের স্মৃতি ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠিত হলেও তা নিয়ে ডানপন্থী মহল থেকে বারবার প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি ইতিহাস নাকি রাজনৈতিক প্রচার। কেপটাউনের ডিস্ট্রিক্ট সিক্স মিউজিয়াম উল্টো পথে হেঁটেছে, রাষ্ট্রের বদলে উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দাদের নিজস্ব উদ্যোগে গড়া, যা তাকে দিয়েছে আলাদা রকম বিশ্বাসযোগ্যতা। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর এই বর্ণালির মাঝামাঝি কোথাও দাঁড়িয়ে আছে। এটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত, আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত, মন্ত্রণালয়ের বাজেটে পরিচালিত, এবং পর্ষদের নেতৃত্বে এখন বসছেন সরকারের মন্ত্রী নিজেই।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের পুরো যাত্রাপথ একটি গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, রাষ্ট্র কি আদৌ স্মৃতির মালিক হতে পারে। জাদুঘরটি যে গল্প বলছে, ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার বিজয়, নিপীড়িতদের প্রতি শ্রদ্ধা, নিপীড়কের প্রতীকী পতন, সেই ইতিহাস সত্য। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ, তা যত সীমিত আকারেই থাকুক, জাদুঘরের নৈতিক পুঁজিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যে প্রতিষ্ঠান রক্ত আর আত্মত্যাগের স্মৃতি রক্ষার দাবিতে গড়ে উঠেছে, তার নির্মাণ ব্যয় নিয়ে জনমনে সন্দেহ থেকে যাওয়াটা এক ধরনের বিড়ম্বনা। কর্তৃপক্ষের বারবার অস্বীকৃতি এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে তদন্তের প্রতিশ্রুতি, এই দুইয়ের মধ্যে যে ফাঁক থেকে যায়, তা ভবিষ্যতে স্বাধীন নিরীক্ষা ছাড়া পূরণ হবে বলে মনে হয় না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সম্ভবত সময়ের। জাদুঘর প্রতিষ্ঠার আইনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে পর্ষদের সভাপতি করার সিদ্ধান্তটি একটি বার্তা দেয়, প্রতিটি নতুন সরকার এই জাদুঘরের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চাইবে। আজ যে আখ্যান রাষ্ট্রীয় সত্য হিসেবে দেয়ালে খোদাই হচ্ছে, দশ বছর পর অন্য কোনো সরকারের অধীনে তা অপরিবর্তিত থাকবে কিনা, সেই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। স্মৃতি যখন আইন দ্বারা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তখন তা রাজনীতির প্রবাহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে পারে না, এটাই বোধহয় প্রতিটি রাষ্ট্র-নির্মিত স্মৃতিসৌধের অলিখিত নিয়তি। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর যত না একটি স্থাপত্য, তার চেয়ে বেশি একটি চলমান আলোচনা, কে বলবে এই গল্প, কীভাবে বলা হবে, এবং সেই বলার অধিকার কার হাতে থাকবে। সেটা সময়ই নির্ধারণ করবে। ●