পঞ্চম মিনিটের ডকুমেন্টারির মধ্যে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য সেটি। একটি ফোনকল, রেকর্ড করা তার নিজেরই গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে, যে সংস্থা পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে তাকে রক্ষা করে এসেছে, কণ্ঠস্বরটি নির্দেশ দিচ্ছে, যেখানেই পাওয়া যাবে গুলি চালানোর। স্টুডেন্ট প্রোটেস্টারদের উপর গুলি চালানোর। আল জাজিরার অনুসন্ধানী টিম বলছে, এই কণ্ঠস্বর শেখ হাসিনার। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই, গণভবন থেকে দেওয়া এক নির্দেশ। এই একটি অডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করেই বানানো হয়েছে Hasina: 36 Days in July ডকুমেন্টারিটি। যেটি গত বছরের জুলাইয়ে প্রচারিত হওয়ার পর সাংবাদিকতার একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও জিতেছে। প্রশ্নটা তথ্যচিত্রটি ভালো কি মন্দ, তা নিয়ে নয়। প্রশ্নটা আরও গভীর। একটি তথ্যচিত্র কি সত্যিই ইতিহাসের প্রথম খসড়া হয়ে উঠতে পারে, নাকি তা কেবল একটি সংস্করণ, প্রতিযোগী আরও অনেক সংস্করণের ভিড়ে?
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে যা ঘটেছিল, তার মাত্রা নিয়ে কিছুটা বিতর্ক থাকলেও মূল কাঠামোটা এখন স্থিরতায় এসেছে। কোটা সংস্কার নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রূপ নেয় এক ব্যাপক গণজাগরণে, যার পরিণতিতে আগস্টের ৫ তারিখ শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। শেষ হয় তার পনেরো বছরের শাসনকাল। জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় চৌদ্দশো মানুষ নিহত হন। যাদের বড় একটা অংশ নিহত হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে, এবং নিহতদের প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ শিশু। প্রতিবেদনে সরাসরি বলা হয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল) ব্যক্তিগতভাবে এই দমন-অভিযান ঘটিয়েছিলেন, এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সতর্কবার্তা সত্ত্বেও প্রোটেস্টারদের উপর বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি।
আর তাই, এই ছত্রিশ দিন কেবল একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কাহিনী না। শেখ হাসিনা সরকারের সহিংসতা প্রথমবারের মতো তাদের নিজস্ব যন্ত্রের মাধ্যমেই রেকর্ড হয়ে গেছে, এবং সেই রেকর্ড পরবর্তীতে বিচার প্রক্রিয়ার কেন্দ্রীয় প্রমাণে পরিণত হয়েছে।
আল জাজিরার তথ্যচিত্রের কাঠামো সহজ, প্রায় থ্রিলারের মতো। এটি প্রথমে দেখায় আবু সাঈদের মৃত্যু, যাকে পুলিশ গুলি করেছিল। কিন্তু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তা মাথায় আঘাতজনিত মৃত্যু হিসেবে দেখানোর জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র চাপ প্রয়োগ করেছে। এরপর তথ্যচিত্রটি ধীরে ধীরে প্রবেশ করে গণভবনের ভেতরে, যেখানে পঞ্চাশটির বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করে শেখ হাসিনা নিজেই নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম তদারকি করতেন। অথচ সেই কলগুলোই রেকর্ড হয়ে যাচ্ছিল তার নিজের গড়া নজরদারি সংস্থার মাধ্যমে। কাঠামোগতভাবে এটি একটি ক্ষমতার আত্মবিধ্বংসী প্রতিচ্ছবি, যে যন্ত্র বানানো হয়েছিল প্রতিপক্ষকে নজরদারি করার জন্য, তা শেষ পর্যন্ত নিজের প্রভুর রূপই উন্মোচিত করে দিল। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আল জাজিরাকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা কখনও প্রাণঘাতী অস্ত্র শব্দটি ব্যবহার করেননি এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে সুনির্দিষ্টভাবে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশও দেননি। তাদের এই অস্বীকৃতি তথ্যচিত্রের অংশ ঠিকই, কিন্তু তা এর কেন্দ্রীয় দাবিকে খণ্ডন করার মতো স্বাধীন কোন প্রমাণ হাজির করে না।
তথ্যচিত্রটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর কেন্দ্রীয় অডিও প্রমাণ। এটি একবার নয়, দুইবার স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে। বিবিসি আই ইউনিট ১৮ জুলাইয়ের একই ফোনকল অডিও ফরেনসিক প্রতিষ্ঠান আর্শটের কাছে পাঠিয়েছিল, যারা এই রেকর্ডে কোনো এডিট বা কৃত্রিম নির্মাণের প্রমাণ পায়নি এবং বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগও কণ্ঠস্বর মিলিয়ে দেখেছে শেখ হাসিনার পূর্ব-রেকর্ডকৃত নমুনার সঙ্গে। দুটি ভিন্ন সংবাদমাধ্যম, ভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া উপাদান নিয়ে, এই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, এতে এই প্রমাণের গুণগত মান বুঝা যায়। তবু কিছু প্রশ্ন থাকে। অডিওটি কে ফাঁস করল, কেন এত মাস পরে, আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কার স্বার্থে, এর উত্তর এখনও অস্পষ্ট।
তথ্যচিত্র ইতিহাসের প্রথম খসড়া হতে পারে না, অন্তত একা তো নয়। কিন্তু তা প্রশ্নমালা রেখে যেতে পারে, যে প্রশ্নগুলো পরবর্তীতে আদালত, গবেষক এবং ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদদের জানতে ও যাচাই করতে সুবিধা হবে।