রাত তখন সাড়ে এগারোটা। মুম্বাইয়ের একটা ফ্ল্যাটে বসে রানা আইয়ুব তার ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে ছিলেন, আর শরীরটা ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে আসছিল। স্ক্রিনে একটা ভিডিও চলছে। ভিডিওতে তিনি নিজে। অন্তত মুখটা তারই। কিন্তু বাকি সবকিছু, শরীরের ভাষা, দৃশ্যটার প্রেক্ষাপট, যা ঘটছে তার প্রতিটা মুহূর্ত, তার কোনোটাই তার নয়। তিনি কখনো এই ঘরে ঢোকেননি। এই মানুষটার সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি। অথচ ভিডিওটা এত নিখুঁত যে নিজের চোখকেই অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল।
তিনি বমি করে ফেললেন। তারপর কাঁদতে শুরু করলেন, এমনভাবে যেভাবে মানুষ কাঁদে যখন বোঝে যে তার শরীরের ওপর তার নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ আর অবশিষ্ট নেই। ভিডিওটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল, আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে ভারতের অর্ধেকের বেশি মোবাইল ফোনে পৌঁছে গিয়েছিল সেটা। চব্বিশ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই তার ফেসবুক আর টুইটার অ্যাকাউন্ট ভরে গিয়েছিল ধর্ষণের হুমকি আর মৃত্যুর হুমকিতে। তার বাড়ির ঠিকানা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, আর দাবি করা হয়েছিল তিনি নাকি বেনামী যৌনসঙ্গমের জন্য উন্মুক্ত। সপ্তাহের পর সপ্তাহ তিনি ঠিকমতো খেতে পারেননি, কথা বলতে পারেননি। ঘর থেকে বের হতে ভয় পেতেন, পাছে কেউ হুমকিগুলো সত্যি করে তোলে।
এটা ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসের কথা। রানা আইয়ুব তখন ভারতের অন্যতম আলোচিত অনুসন্ধানী সাংবাদিক, বিজেপি সরকারের কট্টর সমালোচক, মুসলিম পরিচয়ের কারণে আগে থেকেই যাকে ঘিরে ছিল ঘৃণা আর অপপ্রচারের এক দীর্ঘ ইতিহাস। কিন্তু এবারের আক্রমণটা আলাদা। এবার আক্রমণকারীরা তার লেখা নিয়ে মিথ্যা ছড়ায়নি, তার কথাকে বিকৃত করেনি। তারা তৈরি করেছিল এমন একটা “সত্য” যা আসলে কখনো ঘটেইনি। একটা মানুষের মুখ, তার পরিচয়, তার সম্মান, সবকিছু চুরি করে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল অন্য একটা শরীরের ওপর। এবং এই কাজটা করার জন্য কোনো স্টুডিও লাগেনি, কোনো পেশাদার ভিএফএক্স টিম লাগেনি। লেগেছিল কেবল একটা সফটওয়্যার, কিছু ছবি, আর একটা উদ্দেশ্য।
এই টেকনোলজির নাম দুনিয়া তখনও ঠিকমতো জানত না। কয়েক মাস পরে যখন এই প্রযুক্তির নাম ছড়িয়ে পড়বে গণমাধ্যমে, তখন একে ডাকা হবে “ডিপফেইক”।
কীভাবে সম্ভব হলো এটা? কোন প্রযুক্তি একজন মানুষের মুখকে এভাবে চুরি করে অন্য শরীরে বসিয়ে দিতে পারে, এতটা নিখুঁতভাবে যে খোদ ভুক্তভোগীও প্রথম দেখায় নিশ্চিত হতে পারেন না এটা বাস্তব নাকি কল্পনা?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে এমন একটা গবেষণাক্ষেত্রে যা শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উদ্দেশ্যে। শিল্পের জন্য, বিজ্ঞানের জন্য, এমনকি নিছক কৌতূহলের বশে। যে প্রযুক্তি একদিন একজন সাংবাদিককে নীরব করার অস্ত্র হয়ে উঠছে, সেটার জন্ম হয়েছিল একদল গবেষকের মাথায়, যারা চেয়েছিলেন মেশিনকে শেখাতে কীভাবে একটা ছবি “কল্পনা” করা যায়।
রানা আইয়ুবের গল্প এখানে একা নয়। তার ঠিক পাঁচ বছর পর, ভারতেরই আরেক পরিচিত মুখ, অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানার একটা ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে, এতটাই বিশ্বাসযোগ্য যে দিল্লি পুলিশকে নামতে হয় তদন্তে। তদন্তকারীরা শেষমেশ বিহারের এক ঊনিশ বছর বয়সী তরুণকে খুঁজে বের করলেন, যে ভিডিওটা প্রথম নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে আপলোড করেছিল। আর এরও কয়েক বছর পর, বলিউড অভিনেতা রণবীর সিংয়ের একটা ভুয়া ভিডিওতে তাকে দেখানো হয় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে এবং বিরোধী দলকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতে, যা নিয়ে সাইবার পুলিশে মামলা পর্যন্ত গড়েয়েছে। রণবীর সিংয়ের বাবা নিজে গিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন, দাবি করেন এই ভিডিও তার ছেলের নয়, তৈরি করা হয়েছে।
একটা প্রযুক্তি যেটা শুরুতে ছিল নিছক পরীক্ষাগারের কৌতূহল, সেটা কীভাবে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে হয়ে উঠল সাংবাদিক দমনের অস্ত্র, রাজনৈতিক প্রতারণার হাতিয়ার, আর লাখো নারীর দুঃস্বপ্নের কারণ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে অনেক পেছনে। যেতে হবে এমন এক গবেষণাগারে, যেখানে দুটো নিউরাল নেটওয়ার্ক একে অপরের সঙ্গে এক অদ্ভুত খেলায় মেতে উঠেছিল, একটা তৈরি করছিল মিথ্যা, আরেকটা সেই মিথ্যা ধরার চেষ্টা করছিল। এবং সেই খেলা থেকেই জন্ম নিয়েছিল এমন এক প্রযুক্তি, যা আজ আমাদের বাস্তবতার সংজ্ঞাটাই বদলে দিতে বসেছে।
কিন্তু তার আগে বোঝা দরকার, রানা আইয়ুবের মতো মানুষদের গল্প কেন একা নয়। কেন এই একই প্যাটার্ন বারবার ফিরে আসে বিশ্বজুড়ে, স্কুলের কিশোরী থেকে শুরু করে হলিউড অভিনেত্রী, রাজনীতিবিদ থেকে সাধারণ গৃহবধূ পর্যন্ত। আর কেন এই প্রযুক্তির শিকারদের সিংহভাগই নারী। ডিপট্রেস ল্যাবসের একটি হিসাব অনুযায়ী, অনলাইনে থাকা প্রায় পনেরো হাজার ডিপফেইক ভিডিওর ছিয়ানব্বই শতাংশই যৌন বিষয়বস্তু নিয়ে তৈরি, আর তার নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রেই নারীর মুখ বসানো হয়েছে তাদের অনুমতি ছাড়া পর্নোগ্রাফিক ফুটেজে।
এই সিরিজের বাকি অংশে আমরা অনুসন্ধান করব এই প্রযুক্তির জন্ম থেকে শুরু করে তার অর্থনীতি, তার রাজনীতি, তার আইনি লড়াই আর তার ভবিষ্যৎ পর্যন্ত।