দুয়েক বছর আগে একটা ভিডিও ভাইরাল হইছিল, এক মহিলা তার চাকরি করা স্বামীর দুপুরের খাবারের জন্য পোলাও দিতেছিল, আমরা সেইটা দেখতেছিলাম; গণ্ডগোলটা লাগলো যখন উনি নিজে থেকে আবার ভয়েস দিয়া জানাইলেন যে, তার হাজবেন্ড ‘প্লাউ’ খাইতে ভালোবাসে! ভদ্রমহিলার কাছে পোলাও শব্দ যথেষ্ট স্মার্ট মনে না হওয়ায়, শব্দটাকে আরেকটু রঙ লাগায়া ‘প্লাউ’ বলছেন এবং এর ফলে তার মনে এক ধরণের তৃপ্তি আসছে, আনন্দ পাইছে। তার এই উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং সামান্যে সুখ পাওয়া, হিংসুক আপনাদের সহ্য হয় নাই। আপনারা ট্রল করছেন। তা করতেই পারেন। কিন্তু আপনার বাপ দাদা চৌদ্দগোষ্টির বলা ‘ইচ্ছা’ শব্দকে, একটু রঙ লাগায়া যখন ‘ইচ্ছে’ বলেন, বিশ্বাস করেন, তখন আমাদেরও হাসি ধইরা রাখতে খুব কষ্ট হয়
‘আমাদের ভাষা’ নামক প্রবন্ধে আবুল মনসুর আহমদ বলতেছেন,
‘বাংলাদেশ অখণ্ড থাকিতে কলিকাতা রাজধানী থাকাকালে আমরা কথায় ও লেখায় পশ্চিম-বাংলার ভালমন্দ সবই অনুকরণ করিতাম। এটা ছিল স্বাভাবিক। এই কারণে ততদিন আমরা ‘খাইছি’র বদলে ‘খেয়েছি’, ‘খাইতেছি’র বদলে ‘খাচ্ছি’, ‘করি নাই’র বদলে ‘করি নি’ লিখতাম এবং বলিবার চেষ্টা করিতাম। তার উপর ক্রিয়াপদ ছাড়াও বিশেষ্যের বেলাতে তা করিতে গিয়া ‘ইচ্ছা’র বদলে ‘ইচ্ছে’, ‘হিসাবে’র বদলে ‘হিসেব’, ‘নিকাশে’র বদলে ‘নিকেশ’, ‘মিঠা’র জায়গায় ‘মিঠে’, ‘তুলা’র জায়গায় ‘তুলো’, ‘সুতা’র জায়গায় ‘সুতো’ লিখিতাম এবং বলিবার চেষ্টা করিতাম। এটা তখন দোষের ছিল না। কিন্তু এখন দোষের। লজ্জা ও পরিতাপের বিষয় এই যে, আজো আমরা তাই করি। আমরা ভুলিয়া যাই যে, যে-স্বাভাবিকতা সাহিত্যের প্রাণ, আমাদের এই বিবেক-বুদ্ধিহীন অন্ধ অনুকরণ-প্রিয়তা সেই স্বাভাবিকতাকেই বিদ্রূপ করিয়া থাকে।’1
কলিকাতার প্রমিত ওরফে ‘শুদ্ধ ভাষা’রে নিজের লেখা এবং আলাপ থেকে বিদায় দেওয়ার পর থেকে অনলাইন অফলাইন সব জায়গায় এই কমেন্টটা নিয়মিত পাই যে, আপনি তো বাংলা ভাষাই জানেন না! আগে ভাষা শেখেন! একদল প্রায় শুভাকাঙ্ক্ষীর ভেক ধইরা, মূলত টিটকারি মারতে এই প্রশ্নগুলাও ছুঁইড়া দেন যে, আপনারা যারা এই ‘অশুদ্ধ’ ভাষায় (আঞ্চলিক ভাষায় বা ইনফরমাল বাংলা) লিখতে চান, আপনাদের প্রস্তাবটা কী আসলে? কেন চান এইটা? মানে ভাষা তো আছেই, আবার আপনাদের খিচুড়ি ভাষার কী দরকার? আপনাদের এই জগাখিচুড়ি ভাষার লেখা পড়তে কষ্ট হয়। আমরা তো ছোটবেলা থেকে প্রমিত ভাষা পইড়া শুইনাই বড় হইছি, আবার চেইঞ্জ করতে হবে কেন?
ওরা ১০/১২ বছর সময় নষ্ট কইরা, টাকা খরচ কইরা, অন্য ভাষা শিখতে রাজি আছে, কিন্তু তার মুখের ভাষায় লেখা পড়তে রাজি না! কেউ কেউ অবশ্য আর্গুমেন্ট বোঝেন, এবং তখন বলেন, আমার বাড়ি কুষ্টিয়া বা খুলনা, আমরা তো শুদ্ধ ভাষাতেই কথা বলি, এইটা কি খারাপ?
এদের ধরে ধরে, ‘সে মেলা দিন আগের কথা, এক দেশে ছিল এক’ … সুর করে সেই গোড়ার ইতিহাস বলতে ইচ্ছা করে না। তাই ভাবলাম, ভাষা নিয়া আমার বোঝাপড়াটা সবার সাথে শেয়ার করি। তার আগে বইলা নেওয়া ভালো যে আমাদের আলাপ মূলত লিখিত ভাষা নিয়া, অংশত, মুখের ভাষা নিয়া।
বাংলা ভাষার ইতিহাস
একটা ভাষার জন্ম কখন আর কীভাবে হয় সেইটা বলা মুশকিল। বাংলা ভাষার জন্ম কবে হইছিল তা এখনো সঠিকভাবে বলা যায় না। সেইটা বলা না গেলেও অনেক তালবাহানার পরে এইটা এখন প্রতিষ্ঠিত যে ‘বাংলা ভাষার স্রষ্টা ও বাংলা সাহিত্যের পিতা আসলে বাংলার নবাব-বাদশারাই।’ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তার প্রবন্ধ ‘আমাদের ভাষাসমস্যা’য় আরেকটু বিস্তারিত লিখতেছেন,
‘মুহম্মদ-ই বখতিয়ারের বাংলা জয়ের পরে যখন হইতে মুসলমান বুঝিল এই চির-হরিতা ফলশস্য-পুরিতা নদ-নদী-ভূষিতা বঙ্গভূমি শুধু জয় করিয়া ফেলিয়া যাইবার জিনিস নহে; এ দেশ কর্ম্মের জন্য, এ দেশ ভোগের জন্য, এ দেশ জীবনের জন্য, এ দেশ মরণের জন্য, তখন হইতে মুসলমান জানিয়াছে বাংলা চাই-ই। তাই বাংলার পাঠান বাদশাহগণ বাংলা ভাষাকে আদর করিতে লাগিলেন। যে ভাষা দেশের উচ্চ শ্রেণীর অবজ্ঞাত ছিল, তাহা বাদশাহের দরবারে ঠাঁই পাইল। নসরৎ শাহ, হোসেন শাহ, পরাগল খাঁ, ছুটি খার নাম বাঙ্গালী ভুলিতে পারিবে না। বাদশাহের দেখাদেখি আমীর ওমরা বাংলার খাতির করিলেন। আমীর ওমরার দেখাদেখি সাধারণে বাংলার আদর করিল।’2
ইংরেজরা আসার আগে বাংলা ভাষা চর্চার চিহ্ন পদ্যে অনেক ছিল। এমনকি গদ্যের উদাহরণও ছিল। কিন্তু ওইগুলারে পাত্তা দেয় নাই। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত কইরা ইংরেজরা বাংলা এবং পরে পুরা ইন্ডিয়ায় কলোনী কায়েম করল। বাংলায় খুঁটি গাড়ার পর ইংরেজদের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০) আর ব্রাহ্মণ হিন্দুদের সংস্কৃত কলেজের (১৮২৪) পণ্ডিতদের নিয়া বাঙালিদের বাংলা ভাষা শেখাইলো! সেই শেখানো ভাষা ভালো কি মন্দ সেই প্যাচালে পরে ঢুকি। তার আগে বলি, এই যে আজকে যে বাংলা ভাষা একটা অবস্থায় আছে, এতটা পথ হাঁইটা এত দূর আসছে, এইটার জার্নিটাও এত সোজা ছিল না। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর লেখাতেই পড়ি চলেন,
ভাষাক্ষেত্রেও অভিজাততন্ত্র ও গণতন্ত্র আছে। ভারতীয় ভাষা হইতে আমি ইহার উদাহরণ দিতেছি। যে সময় ঋষিগণের মধ্যে বৈদিক ভাষা প্রচলিত ছিল, সেই সময় সাধারণ আর্য্যগণের মধ্যে বৈদিক হইতে কিছু বিভিন্ন লৌকিক ভাষা প্রচলিত ছিল। বৈদিক ছিল অভিজাততন্ত্রের ভাষা। লৌকিক ছিল গণতন্ত্রের ভাষা। … ঋষিদিগের শত সহস্র দোহাইতেও কিন্তু বৈদিক ভাষা পুজা অর্চনায় ছাড়া অন্যত্র লৌকিক ভাষার নিকট টিকিতে পারিল না। গণতন্ত্রের নিকট অভিজাততন্ত্রের পরাজয় হইল।
পরবর্তীকালে উচ্চ বর্ণেরা লৌকিক ভাষাকে মার্জিত করিয়া সংস্কৃত করিয়া লইল। সাধারণে লৌকিক ভাষা পালি ব্যবহার করিতে লাগিল। ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রকারেরা বলিলেন, “ন স্লেচ্ছভাষাং শিক্ষেত – ম্লেচ্ছ ভাষা শিখিও না।” তখন ব্রাহ্মণ্য ধর্ম্মের দুর্দশা, বৌদ্ধ ধৰ্ম্ম তাহার নবীন তেজে দণ্ডায়মান। কেহ ব্রাহ্মাণের কথা শুনিল না। বৌদ্ধ গণতন্ত্রের পক্ষ লইল। পালি ভাষা এক বিপুল সাহিত্যের ভাষা হইল। গণতন্ত্রের নিকট অভিজাততন্ত্রের পরাজয় হইল।
আর এক যুগ আসিল। এখন রাজশক্তি বৌদ্ধ। বৌদ্ধ এখন অভিজাততন্ত্রের দিকে। বৌদ্ধ এখন ধৰ্ম্মের দোহাই দিয়া পালিকে ধরিয়া রাখিতে চাহিল; তখন কিন্তু গণতন্ত্রের পক্ষ হইল জৈন ধৰ্ম্ম। তখন লৌকিক ভাষা প্রাকৃত। পালি প্রাকৃতের নিকট তিষ্ঠিতে পারিল না। গণতন্ত্রের নিকট অভিজাততন্ত্রের পরাজয় হইল।
আর এক যুগ আসিল। এ-যুগ অন্ধকারময়। এ যুগে উচ্চ শ্রেণীর প্রাকৃত নিম্ন শ্রেণীর অপভ্রংশের নিকট পরাজিত হইল। এই অপভ্রংশ হইল বাংলা, উড়িয়া, আসামী, হিন্দী, গুজরাতী, মারহাঠী প্রভৃতি দেশীয় ভাষাসমূহের মূল।
তার পর আধুনিক যুগ। এ যুগে পণ্ডিতেরা সাধারণের ভাষাকে মাজিয়া ঘষিয়া সাধু ভাষা করিয়া লইলেন, বিশাল জনসাধারণের ভাষাকে ইতর ভাষা বলিয়া ফেলিয়া রাখিলেন। বর্তমানে এই ইতর ভাষা পণ্ডিতের ভাষার উপর আত্মপ্রতিষ্ঠা করিতে চাহিতেছে। পণ্ডিত তাঁহার অন্ধ সংস্কৃতভক্তির জন্য বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের দুর্বহ শিকলে বাঁধিতে চাহিতেছেন। আর ইতর ভাষা সেই শিকলকে কাটিতে চাহিতেছে। তাহার চেষ্টা ফলবতী হইবে কি?3
বাংলা ভাষায় সংস্কৃতের অনুপ্রবেশ
ইংরেজরা ক্ষমতায় বসার পরে বাঙালিদেরকেই বাংলা ভাষার লিখিত রূপ শেখাইতে লাগলো সংস্কৃত কলেজের পণ্ডিতদের সহযোগিতায়। সুযোগ পায়া শত শত বছরের পরাজয়ের ক্ষোভ বাংলা ভাষার উপর ঝাড়ল ব্রাহ্মণ হিন্দু পণ্ডিতরা। মানুষের মুখের চলিত বাংলা থেকে আরবি ফার্সি শব্দ, এমনকি প্রচলিত বাংলা শব্দও গুম করে ফেলল। সেই শূন্যস্থান ভরাট করল দুই হাতে অপ্রচলিত সংস্কৃত শব্দ দিয়া। এইভাবেই বাংলা ভাষার যে স্বাভাবিক যে গতিপথ সেইটা বন্ধ করে বাংলা ভাষার সর্বনাশ করল। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর কলমেই জানি সেই ভয়াবহতার কথা:
যাঁহারা এ পর্য্যন্ত বাঙ্গালা ভাষায় লেখনীধারণ করিয়াছেন, তাঁহারা কেহই বাঙ্গালা ভাষা ভাল করিয়া শিক্ষা করেন নাই। হয় ইংরেজি পড়িয়াছেন, না হয় সংস্কৃত পড়িয়াছেন, পড়িয়াই অনুবাদ করিয়াছেন। কতকগুলি অপ্রচলিত সংস্কৃত ও নূতন গড়া চোয়ালভাঙ্গা কথা চলিত করিয়া দিয়াছেন। নিজে ভাবিয়া কেহ বই লেখেন নাই, সুতরাং নিজের ভাষায় কি আছে না আছে তাহাতে তাঁহাদের নজরও পড়ে নাই। …
আমাদের দেশে সেকালে ভদ্রসমাজে তিনপ্রকার বাঙ্গালা ভাষা চলিত ছিল। মুসলমান নবাব ও ওমরাদিগের সহিত যে সকল ভদ্রলোকের ব্যবহার করিতে হইত, তাঁহাদের বাঙ্গালায় অনেক উর্দ্দূ শব্দ মিশান থাকিত। যাঁহারা শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন করিতেন, তাঁহাদের ভাষায় অনেক সংস্কৃত শব্দ ব্যবহৃত হইত। এই দুই ক্ষুদ্র সম্প্রদায় ভিন্ন বহুসংখ্যক বিষয়ী লোক ছিলেন। তাঁহাদের বাঙ্গালায় উর্দ্দূ ও সংস্কৃত দুই মিশান থাকিত। …
আমাদিগের দুর্ভাগ্যক্রমে যে সময়ে ইংরেজ মহাপুরুষেরা বাঙ্গালীদিগকে বাঙ্গালা শিখাইবার জন্য উদ্যোগী হইলেন, সেই সময়ে যে সকল পণ্ডিতের সহিত তাঁহাদের আলাপ ছিল তাঁহারা সংস্কৃত কালেজের ছাত্র। তখন সংস্কৃত কালেজ বাঙ্গালায় একঘরে। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা তাহাদিগকে যবনের দাস বলিয়া সঙ্গে মিশিতে দিতেন না। তাঁহারা যে সকল গ্রন্থাদি পড়িতেন তাহা এ দেশমধ্যে চলিত ছিল না। এমন কি দেশীয় ভদ্রসমাজে তাঁহাদের কিছুমাত্র আদর ছিল না। সুতরাং তাঁহারা দেশে কোন ভাষা চলিত, কোন ভাষা অচলিত, তাহার কিছুই বুঝিতেন না। হঠাৎ তাহাদিগের উপর বাঙ্গালা পুস্তক প্রণয়নের ভার হইল। তাঁহারাও পণ্ডিতসুলভ দাম্ভিকতাসহকারে বিষয়ের গুরুত্ব কিছুমাত্র বিবেচনা না করিয়া লেখনীধারণ করিলেন। পণ্ডিতদিগের উপর পুস্তক লিখিবার ভার হইলে তাঁহারা প্রায়ই অনুবাদ করেন। সংস্কৃত কালেজের পণ্ডিতেরাও তাহাই করিলেন। তাঁহারা যে সকল অপ্রচলিত গ্রন্থ পাঠ করিয়াছিলেন তাহারাই তর্জ্জমা আরম্ভ করিলেন। রাশি রাশি সংস্কৃত শব্দ বিভক্তি পরিবর্জিত হইয়া বাঙ্গালা অক্ষরে উত্তম কাগজে উত্তমরূপে মুদ্রিত হইয়া পুস্তকমধ্যে বিরাজ করিতে লাগিল। 4
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখতেছেন, ‘এইরূপ সংস্কৃতপ্রিয়তা এবং সংস্কৃতানুকারিতা হেতু বাঙ্গালা সাহিত্য অত্যন্ত নীরস, শ্রীহীন, দুর্ব্বল এবং বাঙ্গালা সমাজে অপরিচিত হইয়া রহিল।’5
মজার ব্যাপার হইল, গুরু বঙ্কিম অযথা সংস্কৃত শব্দের ব্যবহারের সমালোচনা করলেও শিষ্য রবীন্দ্র আবার গদগদ হয়ে বলতেছেন যে, ‘সংস্কৃতের আশ্রয় না নিলে বাংলা ভাষা অচল।’ সংস্কৃত ভাষার এই খাদেম বাংলা সাহিত্যের বিস্তারে সংস্কৃতের ভাণ্ডার থেকে শব্দ এবং শব্দ বানাবার হরেকরকম উপায় বানায়া বাংলা ভষার বিরাট ‘উপকার’ করার ভাব লইছেন। সেইটা যে কতবড় আহাম্মকি ছিল তা তিনি যেমন বোঝেন না, তার উম্মতরাও বোঝে না।
মুসলমানি বাংলা বনাম হিন্দুয়ানি বাংলা
এইখানে আরেকটা মামলা আছে। ওই সময়ে কিন্তু মুসলমানরাও বইসা থাকে নাই। তারাও অল্প বিস্তর চেষ্টা তদ্বির করছে। অনেকে বাংলা ভাষার যে পুঁথির সিলসিলা, সেইটাই মেইনটেইন করছে। মোল্লা মৌলভীরা বাংলা ভাষা শিখতেন কেবল ইসলাম প্রচারের বাহন হিসাবে। যুগের সাথে তাল মেলাইতে না পাইরা ওইগুলা পাত্তা পায় নাই। পলাশীর প্রান্তরে পরাজয়ের শতবছর পরে আবারও সশস্ত্র সিপাহী বিদ্রোহে ব্যর্থ হয়। এতদিন ভাবত অস্ত্র দিয়া মোকাবেলা করতে পারবে। এখন যেহেতু সেই আশা একেবারেই বৃথা হইল, ফলে ইংরেজদের শিক্ষা গ্রহণ করে সেভাবেই মোকাবেলা করার চেষ্টা করে। এরই ধারাবাহিকতায় নবাব লতিফ ও স্যার সৈয়দ আহমদের মতো লোকেরা বাঙালি মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে। ১৮৬০ সালের দিকে শুরু হওয়া এই চেষ্টার ফলে এর এক যুগ পরে কিছু সাহিত্যিকের চেষ্টা দেখা দেয়: কায়কোবাদ এবং মীর মশাররফ হোসনদের আবির্ভাব ঘটে। ১৮৭১ সালে যখন ইংরেজ সরকার মুসলমানদের শিক্ষা বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেয়। ততদিনে পলাশীর পরাজয়ের শত বছর পার হয়ে গেছে। তবু এর ফল পাইতে অপেক্ষা করতে হয় আরও ২/৩ যুগ। শিল্প সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানরা যখন পা ফেলতেছে, ততদিনে কাম সারা হয়ে গেছে।
তবে ওই সময়ে যারা চেষ্টা করছেন তারা ‘হিন্দুয়ানী বাংলা’র বিরুদ্ধে একটা ‘মুসলমানী বাংলা’ আনার চেষ্টা করছেন। এইটা কী জিনিস? সেইটার সবথেকে ভলো ধারণা পাওয়া যায়, ১৮৮৮ সালে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর লেখায়। তিনি লিখতেছেন,
‘অশিক্ষিত মুসলমানেরাও বাংলা ভাষায় বহুতর পুস্তক লিখিয়া থাকেন। তাঁহাদের পুস্তক যে ভাষায় লিখিত হইয়া থাকে, তাহাকে মুসলমানি বাংলা কহে। মুসলমানি বাংলাকে একটি স্বতন্ত্র ভাষা বলিতে পারা যায় না। উহা বাংলাভাষার একটি অবান্তর ভাগ মাত্র। মুসলমান লেখক যে জেলায় বাস করেন, সেই জেলার অনেক প্রচলিত কথা তাঁহার গ্রন্থে স্থান প্রাপ্ত হয়। আর তাহার সঙ্গে সঙ্গে অনেক উর্দু, আরবি ও পারসি মিশ্রিত হইয়া থাকে।’6
ইংরেজের ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক আনুকূল্যে যারা রাতারাতি বাংলা ভাষার একক ইজারা পেয়ে বসলেন, তারা পূর্ববঙ্গের হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে ‘অবান্তর’ তকমা দিলেন! অথচ তারা ভুইলাই গেলেন, এই বাংলা ভাষার আদি পৃষ্ঠপোষক ও পিতা আসলে মুসলমান!
মুসলমানী বাংলার উদাহরণ দিতে গিয়া, শাস্ত্রী মশাই পূর্ববঙ্গ থেকে প্রকাশিত শুজ্জুউজাল বিবির কিচ্ছা নাম একটা বইয়ের হেল্প নিছেন। ওইখান থেকে মাঝখানে মাঝখানে কোট যোগ করছেন। আমিও কয়েকটা লাইন যোগ করলাম,
আল্লা আল্লা বল ভাই যত মুমিনগণ,
শুজ্জু উজাল বিবির কিচ্ছা শুন দিয়া মন।
শুজ্জু উজাল বিবি যদি শুজ্জু পানে চায়,
দেখি আসমানের শুজ্জু সেই লজ্জা পায়।
…
ফরিয়াদ আমার এই শুন পাক সাই,
হুকুম কর আমি আজ দুনিয়া ছেড়ে যাই।
…
এমনি ছুরত তাহে দিল বারিতালা,
চন্দ্র কে জিনিয়া তার ছুরত উজালা।
…
হানিফা বলেন আমি দানা নাহি খাব,
আল্লার নামেতে তবে ফকির হইব।
দীনেশচন্দ্র সেন লিখতেছেন, ‘মুসলমানী বাঙ্গালা বলিয়া এক প্রকার উৎকট বস্তু বাঙ্গালা সাহিত্যের এক কোণে একটা বিরাট স্তুপের মত পড়িয়া আছে। তাহারা ভাবার্থ মৌলবীরা বুঝিবেন। বাঙ্গালী হিন্দু-মুসলমান তাদের মাতার মুখে যে ভাষা শুনিয়া কথা বলিতে শিখিয়াছেন, এ ভাষা তাহা নহে।’
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ জানাইতেছেন, ‘এই ‘মুসলমানী বাঙ্গালা’র জন্ম পশ্চিম বাঙ্গালায়। কতকগুলি উর্দু-ঘেঁসা মোল্লা মৌলবী জুটিয়া এই ভাষার সৃষ্টি করিয়াছেন এবং ‘উর্দুর আবর্জনা আনিয়া বাঙ্গালা সাহিত্যের এই দুর্গতি করিয়াছেন।’ … বাঙ্গালী মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনের কোন স্তরের সহিতই এই ভাষা খাপ খায় না। ভাষার যে একটা মোহিনী শক্তি আছে—যে শক্তি বলে ভাষা ‘কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিয়া’ প্রাণ আকুল করিয়া তোলে, এই ভাষার সে শক্তি নাই।’
এই ভাষা মূলত বাজারের কারণে বটতলা থেকে প্রকাশ করা হইত। বিচিত্র গল্পের মোহেই মানুষ সেইটা পড়ত। দুর্ভাগ্য হইলো, কলকাতার হিন্দুরা এই ‘নকল মুসলমানী বাঙ্গালা’কেই মুসলমানের ভাষা বইলা দূরে ঠেলতে চাইছে। তাইলে কোনটা আসল মুসলমানী বাংলা? ২টা উদাহরণ দিছেন আবদুল করিম:
যৌবনকালেতে কন্যা বড় চিন্তা পায়।
অনঙ্গ-ভুজঙ্গ-বিষ সর্বাঙ্গে বেড়ায়।
সে বিষ নামাতে নাহি ওঝার শক্তি।
স্বামী সে চিকিৎসা—হেতু ঔষধ সুরতি।।
—দৌলত কাজী, লোরচন্দ্রানী।
দ্বিতীয়ার চন্দ্র জিনি ললাট শীখ্রণ্ড।
ত্রিভঙ্গ-ভঙ্গিম ভুরু কামেরকো দণ্ড।
সুকোমল করতল পদ্মনাল-তুল।
চম্পক-কলিকা যিনি সুন্দর আঙ্গুল।
—ছৈয়দ আলাওল, পদ্মাবতী।
উপরের দুই উদাহরণ দিয়া আবদুল করিম বলতেছেন যে, ‘দৌলত কাজী, আলাওল প্রভৃতি অসংখ্য পূর্ববঙ্গীয় কবির ভাষা, (পারিভাষিক শব্দগুলি বাদ দিলে) হিন্দু কবির ভাষার ন্যায় শুদ্ধ সাধুভাষা। সেই ভাষা ‘মুসলমানী বাঙ্গালা’ও নহে, অথবা বটতলার পণ্ডিতদের মত কথিত ‘চট্টগ্রামী ভাষা’ও নহে।
অর্থাৎ এইটাই মুসলমানদের বাংলা ভাষা। যেইটা হিন্দুদের বাংলা ভাষার মতোই। কিন্তু শব্দের ব্যবহার দেইখা মনে হইতেছে যে এই উদাহরণগুলা যথেষ্ট না ‘আসল মুসলমানী বাংলা’ ভাষার উদাহরণ হিসাবে। পদ্যের উদাহরণ আমরা দেখলাম। গদ্যের উদাহরণ?
মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদসিন্ধু প্রকাশ হইছিল ১৮৮৪ সালে। এইটা কলকাতার সার্টিফিকেট পাওয়া বাংলা ভাষা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এই বই সম্পর্কে মন্তব্য করছিলেন, ‘মীর মোশাররফ হোসেন ‘বিষাদ সিন্ধু’ নামক যে পুস্তকখানি রচনা করিয়াছেন, তাহা বাংলার একখানি মহারত্ন।’ বিষাদ সিন্ধুর শুরুর একটা অধ্যায় থেকে একটু পড়া যাক,
"আবদুল জাব্বার ভদ্রবংশসম্ভূত, অবস্থাও মন্দ নহে; স্বচ্ছন্দে ভদ্রতা রক্ষা করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিতে পারিতেন; তজ্জন্য পরের স্বারস্থ হইতে হইত না; তাঁহার ধনলিপ্সা অত্যন্ত প্রবল ছিল। কিসে দশ টাকা উপার্জন করিবেন, কী উপায়ে নিজ অবস্থার উন্নতি করিবেন, কী কৌশলে ঐশ্বর্যশালী হইয়া অপেক্ষাকৃত অধিকতর সুখস্বচ্ছন্দে সংসারযাত্রা নির্বাহ করিবেন, এই চিন্তাই সর্বদা তাঁহার মনে জাগরূক ছিল। তাহার একমাত্র স্ত্রী জয়নাব, স্বামীর অবস্থাতেই পরিতৃপ্তা ছিলেন, কোন বিষয়েই তাঁহার উচ্চ আশা ছিল না। যে অবস্থাতেই হউক, সতীত্বধর্ম পালন করিয়া সংসারযাত্রা নির্বাহ করাই তাঁহার আন্তরিক ইচ্ছা ছিল। ধর্মচিন্তাতেও তিনি উদাসীন ছিলেন না। আবদুল জাব্বার সুশ্রী পুরুষ না হইলেও তাঁহার প্রতি তিনি ভক্তিমতী ছিলেন। স্বামীপদসেবা করাই স্বর্গলাভের সুপ্রশস্ত পথ, তাহা তাঁহার হৃদয়ে সর্বদা জাগরূক ছিল। লৌকিক সুখে তিনি সুখী হইতে ইচ্ছা করিতেন না, ভালবাসিতেন না। ভ্রমেও ধর্মপথ হইতে এক পদ বিচলিত হইতেন না। আবদুল জাব্বার নিজ অদৃষ্টকে ধিক্কার দিয়া সময়ে সময়ে এজিদের ঐশ্বর্য ও এজিদের রূপলাবণ্য ব্যাখ্যা করিতেন। তাহাতে সতীসাধ্বী জয়নাব মনে মনে নিতান্তই ক্ষুন্ন হইতেন। নিতান্ত অসহ্য হইলে বলিতেন, ঈশ্বর যে অবস্থায় যাহাকে রাখিয়াছেন, তাহাতেই পরিতৃপ্ত হইয়া কায়মনে তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা কর্তব্য। পরের ধন, রূপ, দেখিয়া নিজ অদৃষ্টকে ধিক্কার দেওয়া বুদ্ধিমানের কর্তব্য নহে। দেখুন! জগতে কত লোক আপনার অপেক্ষা দুঃখী ও পরপ্রত্যাশী আছে যে, তাহার গণনা করা যায় না। ঈশ্বরের বিবেচনা অসীম। মানুষের সাধ্য কি যে, তাঁহার বিচার এবং বিবেচনায় দোষার্পণ করিতে পারে। তবে অজ্ঞ মনুষ্যগণ না বুঝিয়া অনেক বিষয়ে তাঁহার কৃতকার্যের প্রতি দোষারোপ করে। কিন্তু তিনি এমনি মহান্, এমনি বিবেচক, যাহার যাহা সম্ভবে, যে যাহা রক্ষা করিতে পারিবে, তিনি তাহাকে তাহাই দিয়াছেন। তাঁহার বিবেচনায় তিনি কাহাকেও কোন বিষয়ে বঞ্চিত করেন নাই। কৃতজ্ঞতার সহিত তাঁহার গুণানুবাদ করাই আমাদের কর্তব্য।"
মুহাম্মদ আবদুল হাই এবং সৈয়দ আলী আহসানের বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত বইয়ে মুন্সী মেহেরুল্লাহকে মুসলমান সাহিত্যিক হিসাবে পরিচয় দেওয়া হইছে। তার গদ্যের নমুনা দেখা যাইতে পারে। ১৮৯২ সালে “খ্রীষ্টীয় বান্ধব” নামের মাসিক পত্রিকায় মুন্সী মেহেরুল্লাহর একটা লেখা প্রকাশ হয়। একটা ধর্মীয় তর্কে জড়ায়া এই কথাগুলা লিখছিলেন। এইটা থেকে মুসলমানদের বাংলা ভাষার একটা ধারণা পাইতে পারে। আসেন পড়ি,
"আমরা যখন মুসলমানদের নিকট সুসমাচার প্রচার করি, তখন অনেক মুসলমানেই কহিয়া থাকেন যে, ‘আপনাদের ধর্মশাস্ত্র পরিবর্তিত হইয়াছে। কিন্তু আমাদের কোরান কখনই পরিবর্তিত হয় নাই। খোদাতা’লা মোহাম্মদ (দঃ) এর উপর যাহা নাজেল করিয়াছিলেন অদ্যাপি অবিকল তাহাই রহিয়াছে। আমাদের ধর্মশাস্ত্র যে কখন পরিবর্তিত হয় নাই, একথা মুসলমানদিগকে অনেক পুস্তকে লিখিয়াছি। … যিনি মুসলমান শাস্ত্রে অজ্ঞ, তিনিই বলেন যে, কোরান কখনই পরিবর্তিত হয় নাই। আমরা মুসলমানদিগের হাদিছ এবং অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ হইতে প্রমাণ দিতেছি যে, আসল কোরান বিকৃত ও পরিবর্তিত হইয়াছে।"7
১৮৮৮ সালে শেখ আবদুল রহিমের লেখা হজরত মুহম্মদ স. জীবনচরিত ও ধর্মনীতি বই থেকে গদ্যের নমুনা:
খোদা তা’আলার অনুগ্রহ না হইলে এবং কুসংস্কার হইতে মুক্তিলাভ করিতে না পারিলে মানুষ কোন প্রকারেই সত্যতত্ত্বজ্ঞানের সন্ধান পাইতে পারে না। এই প্রকার কুসংস্কারবর্জিত মনীষিগণের সাহায্য ব্যতীত ধর্মে পূর্ণতা অর্জন করা অথবা ধর্ম বজায় রাখিয়া চলা এবং নৈতিক ও বিশিষ্টগুণসম্পন্ন হওয়া মানুষের পক্ষে অসম্ভব। অন্যথা কেহ কেহ হয়ত উক্ত সাহায্য ব্যতিরেকেও ধর্মে পূর্ণজ্ঞান লাভ করিলেও করিতে পারেন, কিন্তু যে পর্যন্ত তিনি নিজেকে জ্ঞানগোচরে নিষ্পাপ বিবেচনা করিতে না পারেন এবং যে পর্যন্ত তিনি মানবের চিত্ত তাঁহার দিকে আকৃষ্ট করিতে না পারেন এবং আত্মাকে ও লোকসমাজকে তত্ত্বজ্ঞানের দিকে ধর্মভাব দ্বারা পরিচালিত করিতে না পারেন, সে পর্যন্ত তিনি শান্তি লাভ করিতে পারেন না। কেবল বাগাড়ম্বর, বাগ্মিতা ও সত্যবাদিতা দ্বারা ধর্মের সাধন হয় না।8
১৯৫৮ সালে আবুল মনসুর আহমদ বাঙালি মুসলমানের মুখের ভাষার উদাহরণ দিতেছেন, ‘মুসলমান বাংগালীর মুখের বাংলার দৃষ্টান্ত ছিল এইরূপ: ফযরের আউয়াল ওয়াকতে উঠিয়া ফুফু-আম্মা চাচীজীকে কহিলেন, আমাকে জলদি এক বদনা পানি দাও। আমি পায়খানা ফিরিয়া গোসল করিয়া নমাজ পড়িয়া নাশতা খাইব।’
ওই সময় হিন্দু বাঙালির মুখের ভাষা কেমন ছিল? আবুল মনসুর আহমদ উদাহরণ দিতেছেন, ‘হিন্দু বাংগালীর মুখের বাংলার দৃষ্টান্ত ছিল এইরূপ: অতি ভোর বেলা উঠিয়া পিসিমা খুড়া মশায়কে বলিলেন, আমাকে শীগগির এক গাড়ু জল দাও। আমি প্রাতক্রিয়া সারিয়া চান করার পর সন্ধ্যা করিয়া মাধান্নি খাইব।’ আবুল মনসুর আহমদের দাবি, ‘মুসলমানের মুখের ঐ বাংলা ভাষা বিহার হইতে পেশওয়ার এবং অযোধ্যা হইতে কুমারিকা পর্যন্ত জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল ভারতবাসী বুঝিবে। পক্ষান্তরে হিন্দুর মুখের ঐ বাংলা বাংলাদেশের বাইরের হিন্দুরাও বুঝিবে না, অন্যরা পরের কথা।’9
অথচ দেখেন, মুসলমানের মুখের ভাষাকে মুসলমানী বাংলা বলা হইলেও, হিন্দুর মুখের ভাষা হিন্দুয়ানি বাংলা বলা হয় না! কলোনির আগে মুসলমানি বাংলা বা হিন্দুয়ানি বাংলার বাইরেও একটা কমন বাংলা ছিল। তার ২টা উদাহরন দেখব। ২টাই হিন্দু কবির লেখা। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল থেকে পাতশাহের দেবতা নিন্দা নামক অংশ থেকে কয়েকটা লাইন দেখি:
পাতশা কহেন শুন মানসিংহ রায়।
গজব করিলা তুমি আজব কথায়।।
লস্করে দুতিন লাখ আদমী তোমার।
হাতী ঘোড়া উট গাধা খচর যে আর।।
এ সকলে ঝড় বৃষ্টি হৈতে বাঁচাইয়া।
বামন খোরাক দিল অন্নদা পূজিয়া।
সয়তান দিল দাগা ভূতেরে পূজায়।
আল চাউল বেঁড়ে কলা ভুলাইয়া খায়।।
আমারে মালুম খুব হিন্দুর ধরম।
কহি যদি হিন্দুপতি পাইবে সরম।
সয়তানে বাজি দিল না পেয়ে কোরাণ।
ঝুট মুট পড়ি মরে আগম পুরাণ।।
গোঁসাই মর্দ্দের মুখে হাত বুলাইয়া।
আপনার নূর দিলা দাড়ি গোঁফ দিয়া।
হেন দাড়ি বামণ মুড়ায় কি বিচারে।
কি বুঝিয়া দাড়ি গোঁফ সাঁই দিল তারে।।
আর দেখ পাঁঠা পাঁঠী না করি জবাই।
উভ চোটে কেটে বলে খাইল গোঁসাই।।
ভারতচন্দ্রের এই ভাষা কমন বাংলা ভাষার সবথেকে ভালো উদাহরণ। ময়মনসিংহ গীতিকা থেকে আমরা একটা উদাহরণ দেখতে পারি। যেকোনো জায়গা থেকেই নেওয়া যাইতে পারে। চন্দ্রাবতীর দেওয়ান ভাবনা থেকে একটু পড়ি চলেন,
শুনরে পরাণের বন্ধু শুন দিয়া মন।
বিয়া নাই সে হইল মোর পরথম যৈবন॥
মা ও মাতুল মোর আছে তারা ঘরে।
বাছিয়া নিছিয়া বিয়া দিব ভালা বরে॥
ফুল হইয়া ফুটিতাম বন্ধুরে যদি কেওয়াবনে।
নিতি নিতি হইত বন্ধু দেখা তোমার সনে॥
তুমি যদি হইতেরে বন্ধু আসমানের চান।
রাত্র নিশা চাইয়া থাকতাম খুলিয়া নয়ান॥
তুমি যদি হইতেরে বন্ধু ঐ সে নদীর পানি।
তোমারে চাহিয়া দিতাম তাপিত পরাণি॥
একেত অবলা নারী ঘরে বন্দী রই।
দারুণ দুঃখের জ্বালা কেমনে রইয়া সই॥
যেদিন দেখ্যাছি তোমায় ঐ না জলের ঘাটে।
সেই দিন হইতে পাগলা মন ফিরে বাটে ঘাটে॥
মায়েরে না কইতে পারি আপন মনের কথা।
অবলা যে নারী আমি মনে রইল ব্যথা॥
কইও কইও সল্লার কাছে তোমার মনের কথা।
কতদিনে পূরব আশা যাইব দারুণ ব্যথা॥
কতদিনে তোমার সঙ্গে হইব মিলন।
দূরের পানে চাইয়া কন্যা লিখিল লিখন॥
চন্দন ফুলের মালা তার পত্রখানি।
দুতীর অঞ্চলে বান্ধ্যা কন্যা দিল যে মেলানি॥
পত্র না লইয়া সল্লা হইল বিদায়।
পরথম যৈবন লইয়া কন্যা করে হায় হায়॥
এই উদাহরণগুলা বিচার করলে প্রমাণ হয় যে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে একটা কমন বাংলা ছিল। যেইটা নষ্টের দায় হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের ঘাড়ে আছে।
কলকাতার ভাষার প্রতিষ্ঠা
ইংরেজরা কলকাতারে রাজধানী করার পরে বাংলা ভাষা শেখাইতে গিয়া সংস্কৃত কলেজের পণ্ডিতদের সাথে নিয়া দুইহাতে দুর্বোধ্য সংস্কৃত মিশ্রিত কলুষিত বাংলা ভাষায় তর্জমা করতে থাকল। বলাই বাহুল্য সেইগুলা রাষ্ট্রীয় অর্থেই ছাপা হইতে থাকল। রাষ্ট্র জড়িত থাকার ফলে যতই খারাপ হোক, সেইটার একটা গ্রহণযোগ্যতা ছিলই। এবং সংস্কৃতের পণ্ডিতরা কলকাতার বাসিন্দা হওয়ায় না চাইতেও কলকাতার মানুষের মুখের ভাষা অনেকটাই জায়গা পাইতে থাকল। তবে কলকাতার মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি ভাষায় প্রথম লেখার ট্রাই করছিলেন প্যারীচাদ মিত্র ওরফে টেঁকচাদ ঠাকুর আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৭) দিয়া। কাছাকাছি সময়েই কালিপ্রসন্ন সিংহ হুতোম প্যাঁচার নকশা (১৮৬১) লিখছিলেন। প্রথমে কিন্তু এইগুলা সংস্কৃতের খাদেমরা নিতে পারে নাই। তবে পাঠক সমাজে ব্যাপক আদর পায়। এরপর দ্বিজেন ঠাকুর, বঙ্কিম, শরৎ, রবীঠাকুরদের প্রচেষ্টায় কলকাতা ও তার আশেপাশের মানুষের মুখের বুলি বাংলা ভাষা হিসাবে ভালো উদাহরণ তৈরি করে। এইটার সাক্ষ্য দিতেছেন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ,
এখন পুনরায় সাহিত্যিক শক্তিতে ও রাজশক্তির আশ্রয়ে কলিকাতার বুলি বাংলা সাহিত্যের ভাষা হইয়া উঠিতেছে। এখন বাংলার বিভিন্ন জেলার ভদ্রলোক আপোসে কথাবার্তার জন্য কলিকাতার বুলিই ব্যবহার করেন। সাহিত্যিক ভাষা হইয়া উঠিবার ইহাই সূচনা। তারপর রবি বাবু প্রমুখ কলিকাতাবাসী সাহিত্যিকগণের প্রভাবে এই বিভাষা সাহিত্যের ভাষার স্থান অধিকার করিতে চলিয়াছে।
কলকাতার ভাষার প্রতিষ্ঠার পরও ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথের মনে শঙ্কা জাগতেছিল যে একদিন না আবার পূর্ব বাংলার গরীব চাষাভুষারা তাদের ভাষাকে বইয়ের ভাষা কইরা ফেলে! ফলে প্রজাদের জন্য উনি নির্দেশ ফরমাইতেছেন,
‘বাংলাদেশে কোন্প্রদেশের ভাষাকে সাহিত্যিক কথ্যভাষা বলে মেনে নেব। উত্তর এই যে, কোনো বিশেষ কারণে বিশেষ প্রদেশের ভাষা স্বতই সর্বজনীনতার মর্যাদা পায়। … কলকাতা শহরের নিকটবর্তী চার দিকের ভাষা স্বভাবতই বাংলাদেশের সকলদেশী ভাষা বলে গণ্য হয়েছে। এই এক ভাষার সর্বজনীনতা বাংলাদেশের কল্যাণের বিষয় বলেই মনে করা উচিত। যা হোক, যে দক্ষিণী বাংলা লোকমুখে এবং সাহিত্যে চলে যাচ্ছে তাকেই আমরা বাংলা ভাষা বলে গণ্য করব।’10
কলকাতার ভাষাও তো আঞ্চলিক ভাষা। বিশেষ কারণে সেইটা ‘সর্বজনীন’ হইছে। বিশেষ কারণটা কী? ক্ষমতার কেন্দ্র। কলকাতা তখন রাজধানী ছিল। রাজধানী চেইঞ্জ হইছে প্রায় ৮০ বছর হইলো। তবু সেই অঞ্চলের ভাষাই কেন এখনো সর্বজনীন বইলা মানতেছি? ওই যে ‘স্বয়ং’ ‘প্রভু’ ‘বিশ্বকবি’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের বলতেছেন, কলকাতার আঞ্চলিক ভাষা যেন আমরা বাংলা ভাষা হিসাবে মাইনা নেই। ভাষার স্বার্থে ওইটাই নাকি আমাদের করা উচিত! আর বাকি যতগুলা আছে তাদের ব্যাপারে রঠার আর কোন কথা নাই। এক সময় এই সন্দেহও উনারা করতেন যে মুসলমানরাও বাঙালি কিনা! বাইবর্ন বাঙালিকে ওরা বাঙালি বলতেও রাজি না! কী রকম ছোটলোকি! বলত বাংলা ভাষায় মুসলমানদের কন্ট্রিবিউশান আছে কিনা! তাও ভালো পরে ভুল বুঝতে পারছে যে, না, মুসলমানরাও বাঙালি! এখন ঠেলায় পইড়া স্বীকারও করে যে না, মুসলমানদেরও অবদান আছে!
পূর্ব বাংলার মুসলমান এবং গরীব চাষাদের বাংলা ভাষায় অধিকার থাকাকে ইংরেজের পেয়াদা জমিদাররা কখনোই ভালো চোখে দেখে নাই। আমরা সবাই মূলত জানি শনিবারের চিঠি সাহিত্যিক দলাদলি থেকে বের হইছিল। কিন্তু তাদের মূল টার্গেট ছিল পূর্ববঙ্গের লোকদের, আরো ভালো করে বললে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের বাংলা সাহিত্যে আগমন ঠেকানো। এ কথার সাক্ষ্য দিয়া গেছেন শনিবারের চিঠির সম্পাদক সজনীকান্ত দাস তাঁর ‘আত্মস্মৃতি’তে, ‘রাজনীতির ক্ষেত্রে দেশবন্ধু এবং সাহিত্যক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলাম.. সাপ্তাহিক ‘শনিবারের চিঠি’র প্রত্যক্ষ লক্ষ্য ছিলেন।’
আত্মস্মৃতির দ্বিতীয় খণ্ডে শনিবারের চিঠির সাথে নজরুলের সম্পর্ক-সম্বন্ধ চমৎকারভাবে ধরা পড়ছে। উনি লিখতেছেন, ‘সত্য কথা বলিতে গেলে শনিবারের চিঠি’র জন্মকাল হইতেই সাহিত্যের ব্যাপারে একমাত্র নজরুলকে লক্ষ্য করিয়াই প্রথম উদ্যোক্তারা তাক করিতেন। তখন আমি আসিয়া জুটি নাই। অশোক-যোগানন্দ-হেমন্ত এলাইয়া পড়িলে ওই নজরুলী রন্ধ্র-পথেই আমি শনিবারের চিঠি’তে প্রবেশাধিকার পাইয়াছিলাম। প্রকৃতপক্ষে ‘শনিবারের চিঠি’র একমাত্র প্রধান লক্ষ্য ছিল নজরুল এবং ব্যঙ্গ বিদ্রুপেতাকে ধরাশায়ী করাই ছিল সে লক্ষ্যের সঞ্চরণক্ষেত্র।’
নজরুলকে কেন ধরল? কাজী নজরুল ইসলামের আগমন তো কলকাতার সাহিত্যে একটা তুফান ছিল। কলকাতার যে ভাষা এবং সাহিত্য সেইখানে মুসলমান নজরুল তার আরবি ফার্সি শব্দে ভরা ভয়ানক সব কবিতা নিয়া হক দাবি কইরা বসল। নজরুলের পিছ ধইরা পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা অবশ্যই হিন্দুরাও যোগ দিল তাদের ভাষা নিয়া। জীবনানন্দ দাশকেও কিন্তু টার্গেট করা হইছিল ওই পূর্ববাংলার ভাষার আগমন ঠেকাইতে। আরেকটা কারণ ছিল, সে মুসলমান নজরুলের কবিতার অনুকরণে কবিতা লিখত। নজরুল আর জীবনানন্দ দাশ টিইকা গেছেন বইলা আলোচনাটা এখনো রয়া গেছে। বুদ্ধদেব বসুর কথা তাও একটু আকটু মনে থাকার কথা। কিন্তু অন্যরা যেহেতু অতো পপুলার হইতে পারেন নাই, ফলে তাদের নিয়া হাউকাউও নাই।
তো যখন পূর্ববঙ্গের হিন্দু মুসলমানরা একজোটে নিজেদের ভাষার প্রয়োগ ঘটাইছেন, তখন মোহিতলাল মজুমদারদের সহ্য হয় নাই। ফলে হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে ট্রিট করতে হইছে। তিনি লিখছেন:
‘শুনরে পুঙ্গীর পুত,
কোন পদ্মার পার হতে এলে
বুড়ীগঙ্গার ভূত।’
পূর্ববাংলার মানুষ গরীব বইলা তাদের যে মানবাধিকার, নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার সেইটাও কলকাতা কাইড়া নিতে চাইত। বাংলাদেশিরা নিজের মাতৃভাষায় লিখলে তাদের নাকি জাত চলে যায়। ধর্ম অশুদ্ধ হয়। বাংলা ভাষার নাকি অপমান হয়। তাই সেইটা ঠেকাইতে তারা যুদ্ধ পর্যন্ত করতে রাজি ছিল। যুদ্ধ করছেও।
এইটা আমার কথা না, নীরদচন্দ্র চৌধুরী আর মোহিতলাল মজুমদারের মনের কথা। আসেন দেখি এই বিষয়ে নিজের আত্মজীবনীতে কী বলেতেছেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী। আমার দেবোত্তর সম্পত্তি বইয়ের ২০৭ পৃষ্ঠায় তিনি বলতেছেন: “আমরা ‘ধর্মযুদ্ধ’ চালাইতেছি, বাংলাসাহিত্যের উপর ‘অধর্মে’র আক্রমণের বিরুদ্ধে। … আমরা যে একটা সাহিত্যিক অভিযান শুরু করিয়াছিলাম তাহা সাহিত্যিক দলাদলি হইতে নয়।” সাহিত্যিক দলাদলি না হইলে কী মহৎ কাজে অভিযান শুরু করছিলেন? সেইটাই উনি বলতেছেন:
‘আমি কর্মজীবনে প্রবেশ করিবার পর বাংলাসাহিত্যের বিশেষ খবর রাখি নাই। ১৯২৫ সনের প্রথম দিকে মোহিতবাবু আমাকে এ বিষয়ে কিছু কিছু বলিলেন। তিনি এক কবিতাতে লিখিয়াছিলেন, ‘চারিদিকে শিবাদের অশিব চীৎকার’। আমি তখনকার লেখায় দুই চারিটা দৃষ্টান্ত যা দেখিলাম তাহাতে আমারও মনে হইল বাংলাভাষা সাহিত্য অবনতির পথে চলিয়াছে। ১৯২৭ সনে এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হওয়াতেই আমি ‘শনিবারের চিঠি’তে যোগ দিলাম।’
এখন আসেন বুঝতে চেষ্টা করি বাংলা সাহিত্যের উপর অধর্মের আক্রমণ জিনিসটা কী বা বাংলা ভাষা সাহিত্যের অবনতি বিষয়টা কী, খায় না মাথায় দেয়। এই অধর্মের আক্রমণ আর কিছু না—বাংলাদেশিরা (পূর্ববঙ্গের মুসলমান ও হিন্দুরা) নিজের মায়ের ভাষায়, বাংলা ভাষায় লিখতেছে এইটাই বাংলা সাহিত্যের উপর আক্রমণ। যেন বাংলা ভাষাটা তাদের একার! বাংলাদেশিদের না।
তা না হয় বুঝলাম বাংলাদেশিরা বাংলা ভাষায় লিখতে গিয়া আক্রমণ চালাইতেছে ভাষা নষ্ট করতেছে, কিন্তু আক্রমণের ধরণটা কী, কীভাবে ভাষা নষ্ট করতেছে? নীরদ চৌধুরীই তা ব্যাখ্যা করতেছেন: ‘পূর্ববঙ্গের অর্বাচীন যুবকেরা বাংলাসাহিত্যে পূর্ববঙ্গের দাবি আছে মনে করিয়া তাঁহাদের রুচি ও ভাষা অনুযায়ী লেখা শুরু করিলেন।’
জি হ্যাঁ, ইহাই হয় পূর্ববঙ্গের মানুষদের অপরাধ। তা অপরাধের নমুনা কী? নীরদ চৌধুরীই বলতেছেন, সরু গলিকে চিপা গলি বলা। সরু সুতোকে চিকন সুতা বলা। ভাত চড়ানোকে ভাত বসানো বলা। রোগাকে হ্যাংলা বলা। তোলাকে আলগানো বলা।
দেখেন আমার দেবোত্তর সম্পত্তির ২০৮ নম্বর পৃষ্ঠায়:
“মোহিতবাবু একদিন ‘প্রগতি’ পত্রিকায় একটা গল্প পড়িতে পড়িতে হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘ওহে, নীরদ, এটা কি লিখেছে বল তো?’ একটি শিশুকে কোলে তুলিয়া এক যুবতী বলিতেছে, ‘এক আলাগাতেও সুখ!’ মোহিতবাবু বলিলেন, ‘এ কি ‘আগলাতে’র ছাপার ভুল?’ আমি বাঙ্গাল, বুঝিলাম, উত্তর দিলাম, ‘না মাস্টারমশায়, আমরা তোলাকে আলগানো বলি, যেমন ‘এই বাক্সটা এত ভারী যে, আমি আলগাতে পারি না।”
এই রকম অধর্ম যারা করে সরুকে চিপা বলে, ভাত চড়ানোকে ভাত বসানো বলে, রোগাকে হ্যাংলা বলে, তোলাকে আলগানো বলে, তারা কি মানুষের পর্যাযে পড়ে? পড়ে না। তাদের বাংলা ভাষায় লেখা তো দূরে থাক বেঁচে থাকারই অধিকার নাই। তাদের জবাই করা উচিত। সেই কথাই মোহিতলাল মজুমদার বলছেন। নীরদ চৌধুরী লিখছেন:
এই সব কারণে আমরা এই সব তরুণ লেখকদের সাহিত্যিক অভিযানকে সভ্য দেশের উপর অসভ্য জাতির আক্রমণ বলিয়া মনে করিলাম। মোহিতবাবু উহাদের একজনের বিষয়ে লিখিলেন,— ‘আহা, আহা, ওকে মেরো না মেরো না, খেদাইয়া দাও দূরে, ঠাকুর ঘরের আনাচে কানাচে যেন-না বেড়ায় ঘুরে। আছে ত অনেক চাটের দোকান, আছে ত কসাইখানা সেইখানে ওরে আদরে পুষিবে, ঘাড় ধরে নিয়ে যানা।’
নিচু জাতের, অসভ্য জাতের পূর্ব বাংলার মানুষকে কলকাতার দখলকৃত বাংলা ভাষায় ঢুকতে দিতে চায় না! তাদের ভাষা বাংলা হইলেও! এমনকি, পূর্ববঙ্গের লোকজনকে গরু ছাগলের পর্যায়ে নিয়া যাইয়াই থামতেছেন না (ডিহিউম্যানাইজিং), তাদের জবাই করার উপযুক্ত মনে করতেছেন!
ধরা যাক ইংরেজ ভারত দখল করে নাই। বা কলকতায় রাজধানী করে নাই। ধরা যাক রাজধানী করল ঢাকায়। তাইলে কী হইতো? তখন কি কলকাতার ভাষা মান ভাষা হইতো? হইতো না। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলতেছেন, ‘যদি পলাশী ক্ষেত্রে বাংলার মুসলমানের ভাগ্য-বিপর্য্যয় না ঘটিত, তবে হয়ত এই পুঁথির ভাষাই বাংলার হিন্দু-মুসলমানের পুস্তকের ভাষা হইত।’
ঘটনাক্রমে যদি ঢাকাইয়া ভাষাই মান ভাষা হইতো, তখন এই মান ভাষার গোলামরা কী করত? নিশ্চয়ই ঢাকাইয়া ভাষাকেই শুদ্ধ এবং শ্রেষ্ঠ ভাষা বইলা বিনা বাক্য ব্যয়ে মাইনা নিত এবং এখনকার মতোই সেই মান ভাষার দারোয়ান হইতো।
শুদ্ধ ও অশুদ্ধ
এডওয়ার্ড সাঈদ তার বিখ্যাত বই ওরিয়েন্টালিজমে বলতেছেন, যেকোনো কিছু, সেইটা ভাষাও হইতে পারে, সেইটা ‘নির্ভুল’ বা ‘মানদণ্ড’ বানানো কোনো প্রাকৃতিক বা স্বাভাবিক বিষয় না মোটেও। এইটা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার দ্বারা তৈরি হয় সবসময়। উনার ভাষাতেই পড়ি,
There is nothing mysterious or natural about authority. It is formed, irradiated, disseminated; it is instrumental, it is persuasive; it has status, it establishes canons of taste and value; it is virtually indistinguishable from certain ideas it dignifies as true, and from traditions, perceptions, and judgments it forms, transmits, reproduces.11
তর্জমা: কর্তৃত্বের মধ্যে রহস্যময় বা প্রাকৃতিক কিছু নেই। এইটা গঠিত হয়, ছড়ায়া দেওয়া হয় এবং পরিচালিত হয়; এইটা একটা হাতিয়ার, এইটা প্ররোচিত করে; এর আছে নিজস্ব সামাজিক পদমর্যাদা এবং এইটা রুচি ও মূল্যের মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করে। যে সমস্ত ধারণাকে এইটা ‘সত্য’ বইলা মর্যাদা দেয়, এবং যে ঐতিহ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি এইটা তৈরি ও পুনরুৎপাদন করে—তা থেকে এই কর্তৃত্বকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব।
শুদ্ধ ভাষা কী এই ব্যাপারে আবুল মনসুর আহমদ একটা মত দিছিলেন। তার মতে, ‘কথা বলিবার সময় শিক্ষিত বক্তার মুখে সহজে বিনা চেষ্টায় বিনা-কৃত্রিমতায় আপনা-আপনি যা আসিয়া পড়ে তাই শুদ্ধ ভাষা।’ ভাষাবিজ্ঞান বলে, সাধারণ মানুষ যেভাবে কথা বলে, ওইটাই শুদ্ধ ভাষা। এইটা না যে বাংলা একাডেমির নিয়ম মাইনা তাদের কথা বলা উচিত। মূল কথা হইতেছে, এই দুনিয়ায় কোনো ভাষাই অশুদ্ধ না। সব ভাষাই শুদ্ধ। সব ভাষাই পবিত্র। সব ভাষাই সুন্দর। সব ভাষাই গ্রহণযোগ্য। আঞ্চলিক হোক, জাতীয় হোক আর আন্তর্জাতিক হোক। ভাষা যোগাযোগের মাধ্যম। একজন মানুষ তার ব্যবহার করা ভাষা দিয়া যদি অন্যদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, তাইলেই সেইটা শুদ্ধ ভাষা।
রাষ্ট্রের প্রয়োজনে স্ট্যান্ডার্ড ভাষার অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না; কিন্তু কলকাতার আঞ্চলিক ভাষার একচ্ছত্র শ্রেষ্ঠত্বের দাবি অস্বীকার করা যায়।
এক ছেলে শব্দই ধরেন। কলকাতার লোকজন বলে ছেলে। ঢাকাইয়ারা বলে, পোলা। বগুড়ার মাইনষে কয় ছোল, বেটা। চিটাগাইঙ্গারা কয়, ফুয়া। সিরাজগঞ্জের মাইনষে কয়, গেদা, ছ্যাড়া। বরিশাইল্লারা বলে, মনু। ওইসব অঞ্চলের মানুষজন যখন নাটক সিনেমা করে তখন কি আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয়? বাংলাদেশের জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খানের একটা সিনেমা আছে, চিটাগাইঙ্গা পোয়া, নোয়াখাইল্লা মাইয়া। আরেকটা দেখলাম শাবনূর আর শাকিব খানের, ঢাকাইয়া পোলা, বরিশালের মাইয়া। মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ ইউটিউবেই। এই মুভিগুলা সারা বাংলাদেশের মানুষ দেখে। বোঝে। তাদের কোনো অসুবিধা হয় না। সারাদিন যে দেশের খবর দেখানো হয়, মানুষ জনের ইন্টারভিউ নেওয়া হয়, ওইগুলাও কিন্তু মানুষ বুঝতে পারে। কেউ বলেও না যে এইগুলা তো অশুদ্ধ ভাষা।
কোরান শরীফ ১০ রকমভাবে তেলাওয়াত করা যায়। মানে আরবি ভাষারই ১০টা ধরণ আছে। একেক শব্দের উচ্চারণ একেক অঞ্চলে একেক রকম। আপনি যদি ওইভাবে পড়েন পাপ হবে না। ওইগুলা অশুদ্ধও না।
অথচ দেখেন, ঘটনাক্রমে কলকাতার ভাষা মান ভাষা হয়ে গেছে, আর সেই ভাষাকেই শুদ্ধ ধইরা বাকি সবগুলারে অশুদ্ধ বলা শুরু করছে। আবুল মনসুর আহমদ এর পেছনে একটা হীনমন্যতা দেখতে পাইছেন। প্রগতিশীল হওয়ার একটা ভুয়া খোয়াব উনারা দেখেন। মনসুর সাহেব বলতেছেন,
‘বাংগাল’ বা ‘মুসলমান’ বলিয়া নিজেদের বাপ-দাদার আমলের মুখের লফজগুলি বাদ দিলেই আমরা ‘আধুনিক’ ও ‘প্রগতিশীল’ হইয়া যাইব না। গোশতের বদলে ‘মাংস’, আন্ডার বদলে ‘ডিম’, জনাবের বদলে ‘সুধী’, আরযের বদলে ‘নিবেদন’ তসলিমবাদ এর বদলে ‘সবিনয়’, দাওয়াত-নামার বদলে ‘নিমন্ত্রণ-পত্র’, শাদি-মোবারকের বদলে ‘শুভ বিবাহ’ ব্যবহার করিলেই আমরা ‘সভ্য’ কৃষ্টিবান ও সুধী বিদগ্ধ হইলাম, নইলে হইলাম না, এমন ধারণা হীনমন্যতার পরিচায়ক। কৃষ্টিক চেতনা ও রেনেসাঁর জন্য এটা অশুভ ইঙ্গিত। আমাদের তরুণ ‘প্রগতি’বাদীদের মধ্যে ইদানিং এই বাতিক খুব জোরসে দেখা দিয়াছে। এটা আশংকার কথা।
আমি বলি না যে, গোশতের বদলে ‘মাংস’ আন্ডার বদলে ‘ডিম এমনকি পানির বদলে জল বলা চলিবে না। বরঞ্চ আমার মত এই যে, এইগুলি সমার্থবোধক বাংলা প্রতিশব্দ। সাহিত্যে উভয় শব্দই ব্যবহার করা হইছে। প্রয়োজনমতো। কিন্তু এরা একটা ছাড়িয়া আরেকটা ধরিতে যাওয়াতেই আমার যত আপত্তি। … ছাড়া ও ধরার মধ্যে একটা হীনমন্যতা ও পরাজিতের মনোভাব লুকাইয়া আছে। (আমাদের ভাষা: আবুল মনসুর আহমদ। ১২৯/১৩০।)
কুশিক্ষায় শিক্ষিত মিডল ক্লাস, যারা বাংলা একাডেমির ডিকশনারিরে পবিত্র কিতাব বইলা জ্ঞান করেন। লিঙ্গুইস্টিক প্রিজুডিসে ভোগা বর্ণবাদী সমাজের স্বভাব এইগুলা। কালচারাল ফ্যাসিস্ট, যারা মনে করেন উনারা যেইটা শিখছেন, ওইটাই ঠিক, এর বাইরে আর কিছু হইতে পারে না! ‘স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলছেন’, কলকাতার ভাষাকেই বাংলা ভাষা বইলা মাইনা নেওয়া উচিত। অতএব, তথাস্তু! এরপর যেন আর কথা হইতে পারে না!
সমাজ ও মানুষের সাথে ভাষার সম্পর্ক খুব গভীর। নিজের ভাষায় চিন্তা করলে, চিন্তার গতি দ্রুত হয়। অন্যের ভাষা, যেইটা শিখতে হয়, সেই ভাষায় চিন্তা করলে, চিন্তার যে স্বাভাবিক গতি সেইটা বাধাগ্রস্ত হয়। রংপুরের প্রাইমারিতে পড়া একটা ছেলেকে তার নানাবাড়ির গল্প জিগ্যেস করেন, সে বলতে পারবে, কোনো সমস্যা হবে না। মুখে বাজবে না। কিন্তু তাকে তার বাংলা বইয়ে পড়া একটা গল্প বলতে বলেন, সে সহজে বলতে পারবে না। সে আগে বইয়ের ভাষায় চিন্তা করতে চাবে, ওইভাবেই বলতে চাবে। পারবে না বইলা আটকায়া যাবে। আবার ওই একই গল্প যখন তার ভাষায় পড়ানো হবে, তার মতো করেই বলতে বলা হবে, তখন কিন্তু সেইটা আর বাজবে না।
বাংলা ভাষার রাজধানী
কোন ভাষা প্রমিত হবে আর কোন ভাষা উপভাষা হবে তা কখনোই ব্যাকরণবিদরা ঠিক করে না; ঠিক করে ক্ষমতার কেন্দ্র। ভাষার প্রমিতকরণ একটা সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। এর জড়িত রাষ্ট্র, শিক্ষা, প্রশাসন, সামাজিক শ্রেণি এবং সাংস্কৃতিক ক্ষমতা। ব্যাকরণবিদরা এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু তারা শূন্যে দাঁড়ায়া কোনো ভাষার ‘শ্রেষ্ঠ’ রূপ আবিষ্কার করে না। যে ভাষারূপ সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অধিক ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানগুলার স্বীকৃতি পায়, সেটাই আস্তে আস্তে প্রমিত বা শুদ্ধ ভাষার মর্যাদা অর্জন করে। অন্য রূপগুলো তখন আঞ্চলিক, অপ্রমিত, কথ্য কিংবা ‘অশুদ্ধ’ বইলা চিহ্নিত হয়।
গ্রামসির মতে, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম না। এইটা হেজিমনি ও ক্ষমতার লড়াইয়ের একটা প্রধান হাতিয়ার। উনার বয়ানেই পড়ি:
Each time the question of language surfaces, in one way to another, it means that a series of other problems are coming to the fore; the formation and enlargement of the managing class, the need to establish more intimate and secure relationships between the governing groups and the national-popular mass, in other words to reorganize cultural hegemony.12
তর্জমা: ভাষার প্রশ্ন যখনই কোনো না কোনোভাবে সামনে আসে, তার সঙ্গে আরও কয়েকটা সমস্যাও সামনে চলে আসে। শাসক বা ব্যবস্থাপনা-নিয়ন্ত্রক শ্রেণির গঠন ও বিস্তার, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের আরও ঘনিষ্ঠ ও নিরাপদ সম্পর্ক তৈরি করার প্রশ্ন। অন্য কথায়, সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কাঠামো নতুন করে সাজানোর প্রশ্ন।
পশ্চিম পাকিস্তানিরা উর্দু ভাষা পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা করার কথা বলত, এর পেছনের যুক্তিটা দেখেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান অভিন্ন রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রের কেন্দ্রে যে-ভাষা প্রচলিত পূর্ব পাকিস্তানে যদি সে ভাষা প্রচলিত না থাকে তবে রাজনৈতিক ও কৃষ্টিগত সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।’ বাংলাদেশের মানুষ কেন্দ্রের এই অন্যায় আবদার মানে নাই। বুকের তাজা রক্ত দিয়া নিজের ভাষা রক্ষা করছে। এরপর ১৯৭১ সালে রক্তাক্ত যুদ্ধের ভেতর দিয়া তাদের তাড়ায়া দিয়া দেশ স্বাধীনও করছে। কেন্দ্রও চেইঞ্জ হইছে। বাংলা ভাষার রাজধানী হিসাবে স্বাধীন বাংলাদেশ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে।
খেয়াল করেন, ভাষার জন্য জান দিলো, ঢাকার মানুষ। অথচ ঢাকার মানুষের নিজের ভাষার ওপর কোনো কর্তৃত্ব নাই। কলকাতার ভাষা এখনো আমাদের শিখতে হইতেছে! কেউ যদি ওদের ভাষায় না লেখে তাইলে তার লেখা ছাপা হবে না, পড়া হবে না, তারে লেখক হিসাবেও স্বীকার করা হবে না!
কলকাতা থেকে আলাদা হওয়ার পর এই যে ৮০ বছর চলে গেল, এত এত রেজিম চেইঞ্জ হইল, এত ক্ষমতার পালা বদল হইল, তারপরও যে নিজেদের ভাষাকে আমরা স্ট্যান্ডার্ড বানাইতে পারলাম না, তাইলে কি ধরে নিব যে বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্র প্রকৃত অর্থে চেইঞ্জই হয় নাই? হোক বা না হোক, তবু বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের রাজধানী এখন ঢাকা। পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিকেরাও স্বীকার করেন, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বাংলাদেশেই বেঁচে থাকবে।
১৯৫৮ সালে আবুল মনসুর আহমদ উচ্চারণ করছিলেন, ‘বাটোয়ারার আগে বাংলার রাজধানী সুতরাং সাহিত্যিক কেন্দ্র ছিল কলিকাতা। এখন সে জায়গা দখল করিয়াছে ঢাকা।’ আশির দশকের কবি আল মাহমুদ ঘোষণা দিছিলেন, ‘ঢাকাই হবে বাংলা সাহিত্যের রাজধানী’। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সরাসরি এই কথা না বললেও, কাছাকাছি একটা কথাই বলছিলেন, ‘বাংলাদেশের সাহিত্যের ভাষা হবে বাংলাদেশের জনগণের মুখের ভাষার কাছাকাছি।’
আহমদ ছফা জানাইতেছেন,
কলকাতাস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের উদ্যোগে হাই কমিশন অফিসে বাংলাদেশের সাহিত্যের গতি প্রকৃতির উপর একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশের সুপরিচিত লেখকদের অনেকেই ওই সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কারা কারা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের সকলের নাম উল্লেখ করা আমার এই রচনার জন্য জরুরি বিষয় নয়। সেমিনারে একটা বিষয় নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছিল বাংলাদেশের উপন্যাসের ভাষা কি রকম হবে। ওই সেমিনারটিতে সভাপতিত্ব করেছিলেন পশ্চিম বাংলার অত্যন্ত সুপরিচিত লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আমাদের দেশের লেখকেরা এ বিষয়ে তাদের নিজ নিজ বক্তব্য প্রকাশ করেছিলেন। কে কি বলেছিলেন সেসব হারানো কথাও আবার ভুল করে জাগিয়ে তুলতে চাই না। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বক্তব্য পরিবেশন করার পালা যখন এলো তিনি ডায়েসে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত কাটাকাটা ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের সাহিত্যের ভাষা হবে বাংলাদেশের জনগণের মুখের ভাষার কাছাকাছি। তাতে করে যদি পশ্চিম বাংলার ভাষার চাইতে বাংলাদেশের সাহিত্যের ভাষা বিশেষ করে উপন্যাসের ভাষা সম্পূর্ণ একটি আলাদা খাতে প্রবাহিত হয়ে যায় সেটা সকলের স্বাভাবিক বলেই ধরে নেওয়া উচিত। ইলিয়াস সাহেবের সোজা সাপটা এই দর্পিত উচ্চারণ পশ্চিম বাংলা সাহিত্যের মোরলদের যে ভালো লাগেনি সে সন্ধ্যাবেলাতেই তার প্রমাণ পাওয়া গেল। কলকাতার সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা গ্রান্ড হোটেলে বাংলাদেশের লেখকদের একটি ডিনারের মাধ্যমে আপ্যায়িত করেছিলেন। ওই ডিনারে বাংলাদেশের অন্য সকল অংশ গ্রহণকারী লেখককে নিমন্ত্রণ করা হলেও ইলিয়াসকে ডাকা হয়নি। আক্তারুজ্জামান ইলিয়াস আনন্দবাজার পত্রিকার এই ধরনের শালীনতাহীন আচরণে ভয়ঙ্কর ব্যথিত অপমানিত বোধ করলেন। একথা তিনি কলকাতা থেকে ফিরে এসে আমাদের কাছে অত্যন্ত ক্ষোভ এবং বেদনার সঙ্গে প্রকাশ করেছেন। তিনি এরকম একটা দৃঢ় সংকল্প আমাদের কাছে জানিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের উপন্যাসের ভাষা কিভাবে বাংলাদেশের মানুষের মুখের ভাষার অনুভব হয় তার একটা দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করবেন। আনন্দবাজার এবং আনন্দবাজারের তথাকথিত উচ্চিষ্ট ভোগী এপার ওপারের মোড়লদের দেখিয়ে দেবেন।13
এরপরই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস খোয়াবনামা লিখলেন। সেইটা এখন ইতিহাস।
খেয়াল করার মতো বিষয় দেখেন, সময় যতই গেছে বক্তাদের গলার আওয়াজ ততই নিচা হইছে। আবুল মনসুর আহমদের কথায় ছিল দৃঢ়তা। কনফার্মেশন। কিন্তু আল মাহমুদের কণ্ঠে এখনো নিশ্চিত না। যেন রাজধানী হয় নাই। ভবিষ্যতে হবে। আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথায়ও আছে অনিশ্চয়তা। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টা। এইটা কেন হইছে? ‘ভারত আমাদের দেশ স্বাধীন করে দিছে’। সেই ‘স্বাধীনতার ঋণ গোলামি দিয়া শোধ’ করে যাইতেছি।
ফলও কম ভোগ করতেছি না। আমার লেখা কোনোদিনই প্রথম আলো ছাপতে পারবে না। কিংবা আবুল মনসুর আহমদের ছেলের ডেইলি স্টারেও ছাপবে না। আমি দিব কিনা সেইটা তো আছেই। ফলে যারা ভিন্নভাবে চিন্তা করে, কিংবা মৌলিক চিন্তা করে, এইভাবেই রাষ্ট্র ও মিডিয়া অ-প্রমিতদেরকে এক্টিভলি খারিজ ও মাইনাস করে। মজার ব্যাপার হইলো, কলকাতার ভাষা খোদ কলকাতাতেই মরার দশা। হিন্দির চাপে কোনঠাসা। ওরা প্রায়ই হিন্দির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে। অথচ আমরা এখনো সেই ভাষা জিন্দা রাখতেছি!
ভাষার এই ক্ষমতার রাজনীতি শুধু বাংলা ভাষার ব্যাপার না। ইংরেজির দিকে তাকাইলেও একই জিনিস দেখা যায়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কারণে ইংল্যান্ডের ইংরেজি একসময় পৃথিবীর নানা জায়গায় মর্যাদার ভাষা হইয়া উঠছিল। কিন্তু আমেরিকা স্বাধীন হওয়ার পর আমেরিকানরা ব্রিটিশ ইংরেজির হুবহু অনুকরণ কইরা যায় নাই। নোয়াহ ওয়েবস্টারের অভিধান, বানান ও ভাষাচর্চার মধ্য দিয়া আমেরিকান ইংরেজি ধীরে ধীরে নিজের আলাদা পরিচয় দাঁড় করাইছে। colour হইছে color, centre হইছে center। এইগুলা শুধু বানানের পার্থক্য না, ভাষার ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠারও একটা ঘোষণা।
১৫০ বছরের চেষ্টার পরে এখন আর আমেরিকান ইংরেজিকে কেউ ব্রিটিশ ইংরেজির ‘অশুদ্ধ ইংরেজি’ বইলা বাতিল করে না। দুইটাই ইংরেজি, দুইটারই নিজস্ব সাহিত্য, অভিধান, উচ্চারণ, বানান ও রীতিনীতি আছে। অর্থাৎ একটা ভাষার একাধিক শক্তিশালী মান থাকতে পারে। ব্রিটিশ ইংরেজির অস্তিত্ব আমেরিকান ইংরেজির বিকাশের পথে বাধা হয় নাই। আবার আমেরিকান ইংরেজির বিকাশও ব্রিটিশ ইংরেজিকে মাইরা ফেলে নাই। ফলে আমরা কেন আশা করতে পারব না, বাংলার ক্ষেত্রেও এমনটা সম্ভব?
নিজ ভাষার গুরুত্ব
বাংলাদেশের মানুষের প্রথম স্বাধীনতা ছিল ১৯৪৭। ইংরেজ বিদায় নেওয়ার ফলে তাদের তৈরি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারি প্রথাও উঠে যায়। এর ফলে সবথেকে বড় উপকার পাইছে বাংলাদেশের সাধারণ চাষাভূষারা। সবথেকে ক্ষতি হইছে কলকাতার জমিদারদের। অথচ বাংলাদেশের মানুষের সেই জয়ের কথা চাপা পড়ে যায় কলকাতার জমিদারদের দেশভাগের নাঁকি কান্নার নিচে। এত বছর পরেও স্বাধীনতা না বইলা দেশভাগ বলতে হয়!
এইগুলা হইল নিজের ভাষা দাঁড় করাইতে না পারার ফল। কালচারাল পলিটিকসে আমরা ফেইল করছি। এই জন্যই দেখেন আবুল মনসুর আহমদের কণ্ঠে যেই দৃঢ়তা, সেইটা নাই হয়ে গেছে আল মাহমুদের কণ্ঠে, আর কাঁপতেছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কণ্ঠে। নিজের ভাষার গুরুত্বটা আমাদের বুঝতে শিখতে হবে। কারা তোমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায় সেইটা বুঝতে হবে।
এই ব্যাপারে এডওয়ার্ড সাঈদের কথা মনে পড়তেছে। উনি তার কালচার এন্ড ইম্পেরিয়ালিজম বইয়ে বলতেছেন, The power to narrate, or to block other narratives from forming and emerging, is very important to culture and imperialism.14 অর্থাৎ, বর্ণনা করার ক্ষমতা, অথবা অন্য বয়ানকে গড়ে উঠতে ও প্রকাশিত হতে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা—সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রায় ৮০ বছর আগে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ আলাদা হইছে। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। এই অঞ্চলের মানুষের কালচারের সাথে কলকাতার কালচারের ব্যাপক পার্থক্য। আপনাদের মনে কী একবারও প্রশ্ন জাগে না, এখনও কেন আমরা কলকাতার আঞ্চলিক ভাষাকে বাংলা ভাষা বলব, শুদ্ধ মনে করব আর আমাদের ভাষাকে আঞ্চলিক ভাষা বলব, অশুদ্ধ মনে করব? এইটা কি কলোনীর ঘটনা না? বাংলাদেশ কি চিরদিনই দিল্লির কলোনী হয়াই থাকবে?
এই আলাপে অবশ্যই পাকিস্তান একটা ঘটনা। ওরা অস্ত্রের সাহায্যে ভাষা কাইড়া নিতে চাইছে। তাদের অস্ত্রটা দেখা যায়। তাদের সাথে লড়াই কইরা ভাষা রক্ষা করছেন। মুখের ভাষা কাইড়া নিতে দেন নাই। কলকাতা ওরফে দিল্লির বিরুদ্ধে দাঁড়াইতে পারতেছেন না কেন? কারণ অস্ত্রটা দেখা যায় না। যেই অস্ত্র দেখা যায়, সেইটার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায়। লড়াই করা সহজ হয়। কিন্তু যেই অস্ত্র দেখা যায় না, সেই ভূতুইড়া অস্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন কেমনে? লড়বেন কেমনে?15
যত পদ্ধতি আছে সব দিয়াই লড়াই করতে হবে। আগে ঠিক করতে হবে কার ফ্রন্ট কোনটা। তারপর যার যার জায়গা থেকে নিজের লড়াইটা চালায়া যাইতে হবে। এইখানে জার্মানির কথা আমরা ইয়াদ করতে পারি। ইউরোপের এই শক্তিধর জাতির নিজ দেশে খোদ জার্মান ভাষাই অসভ্য ছিল। জার্মানরা নিজেদের ভাষা আর সভ্যতারে রোমান আর ফরাসিদের ভাষা সভ্যতার তুলনায় অবজ্ঞার চোখে দেখত। যখন তারা নিজেদের ভাষায় সাহিত্য চর্চা শুরু করল, নিজেদের ভাষায় দর্শন চর্চা করা শুরু করল তখন তারা নিজেদের শক্তি টের পাইল। এমনকি এক সময় পৃথিবীর সেরা জাতি হিসাবে নিজেদের ক্লেইমও করা শুরু করল! সেইটা যদিও পরে বড় একটা ক্যাচাল বাঁধাইছিল। আমরা সেই পথে হাঁটতে চাই না।
আমাদের লেখার ভাষা
প্রবন্ধের শুরুতেই বলছি, এই আলাপ মূলত লিখিত বাংলা নিয়া। লিখিত ও মৌখিক ভাষার পার্থক্য তো একটু থাকেই। আপনি যতই চেষ্টা করবেন, উচ্চারণ পুরাপুরি শব্দের শরীরে ধরতে পারবেন না। তবু যতটুকু পারা যায় সেই চেষ্টাটা করতে হবে। লিখিত ও মৌখিক ভাষার পার্থক্য যত কম হয় ততই ভালো।
আশার বিষয় হইতেছে, লিখিত ভাষার ওপর যতই পোদ্দারি করা হোক, মুখের ভাষা এখনো পুরাপুরি দূষিত হয় নাই। দেশের সাধারণ মানুষ এখনো খাঁটি বাংলা ভাষায় কথা বলে। শিক্ষিত মিডল ক্লাসের কিছু অংশের মুখের ভাষা অশিক্ষা কুশিক্ষা ও কলকাতার সাংস্কৃতিক প্রভাবে কলুষিত।
এর আগে উদাহরণ দিয়া দেখাইছি, কলকাতার ভাষার সাথে আমাদের ভাষার পার্থক্য অনেক। যেইটা স্বাভাবিক না। ওইভাবে লেখার কারণে আমাদের ভাষার নিজস্বতা নষ্ট হয়ে যাইতেছে। যতদিন আমরা কলকাতার ভাষা (কলকাতা ভাষা বাহিত দিল্লির আধিপত্য) বাংলাদেশে মেনে নিব, ততদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সুদৃঢ় করতে পারব না।
এই ব্যাপারে নকীব আল-আত্তাসের স্মরণাপন্ন হওয়া যায়। ভাষা, চিন্তা ও মানুষের ওয়ার্ল্ডভিউয়ের সম্পর্ক নিয়া আল-আত্তাসের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আছে। তিনি দেখাইছেন, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম না। ভাষা, চিন্তা ও বুদ্ধি পরস্পর সম্পর্কিত এবং মানুষের ওয়ার্ল্ডভিউ বা বাস্তবতার দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে ভূমিকা রাখে। তার ভাষায়,
Language, thought and reason are interconnected and interdependent in projecting to man his worldview or vision of reality... The fundamental elements of the worldview together with the key terms and concepts that they unfold, have profound bearing upon a Muslim's life and thought, and are permanently established.16
তর্জমা: ভাষা, চিন্তা ও বুদ্ধি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত ও পরস্পরনির্ভরশীল। মানুষের কাছে তার ওয়ার্ল্ডভিউ বা বাস্তবতার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশে এদের ভূমিকা রয়েছে। একটা ওয়ার্ল্ডভিউয়ের মৌলিক উপাদান এবং সেগুলার সঙ্গে সম্পর্কিত মূল পরিভাষা ও ধারণাগুলা একজন মুসলমানের জীবন ও চিন্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে এবং স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে।
উনি যেইটা বুঝাইতে চাইছেন, প্রত্যেকটা ভাষার তো একটা ওয়ার্ল্ডভিউ থাকে। কলকাতার ভাষা ও সাহিত্যে মুসলমানের উপস্থিতি, তার ইতিহাস, তার কৃষ্টি, তার জবান, তার রীতি-নীতি কিছুই হাজির নাই। রবীন্দ্রনাথ বলেন, মানিক বলেন, জীবনানন্দ দাশ বলেন, কারো লেখাতেই নাই। এইটা কেন হইছে? কলকাতার ভাষার ওয়ার্ল্ডভিউয়ের কারণে। এই ভাষা এমনভাবে সেট করা হইছে, যার ওয়ার্ল্ডভিউ বৈদিক বা মহাভারতীয়। এখন, মহাভারতে তো আর মুসলমান নাই। আপনাকে সে জায়গা দিবে কেমনে?
ধরেন, আপনি যখন বলবেন, তোমার জন্য জান কুরবান। তখন আপনি কী দেখবেন? কুরবানি শব্দ সেমেটিক যে ভিউ সেইটা নিয়া আসবে। আপনার অজান্তেই তখন ইব্রাহিম আর তার পুত্রের সেই মিথের কথা চইলা আসবে।
আবার একই কথা যদি এইভাবে বলেন, তোমার জন্য আমার জীবন বিসর্জন দিতে পারি। তখন আপনি বৈদিক যে ভিউ সেইটা প্রতিষ্ঠিত করবেন। আপনি জানেন আর না জানেন। এই আলাপ বুঝবেন, যখন দেখবেন, আমাদের অনেক মেয়েরাও সৌন্দর্য্যের জন্য শাখা পরে। অথচ ওইটা পুরাই একটা ধর্মীয় ঘটনা। আপনি কোনো হিন্দু মেয়েকে হিজাব পরাইতে পারবেন সৌন্দর্য্যের দোহাই দিয়া?
জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ে একটা মুসলমান ছেলে পুনর্জন্মের চিন্তায় প্রভাবিত হবে। আবার আসিব ফিরে কবিতা যতবার সে পড়বে, ততবার সে তার নিজস্ব ওয়ার্ল্ডভিউ থেকে সরে জীবনানন্দ দাশের সেই বৈদিক ওয়ার্ল্ডভিউতে আশ্রয় নিবে। তো এইগুলা মোটেও সহজ বিষয় না। ফলে আমাদের নিজেদের বাংলা ভাষাতেই সাহিত্য করতে হবে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, একেক অঞ্চলের একেক রকম টোন। তাইলে কোনটারে স্ট্যান্ডার্ড ধরব? আবুল মনসুর আহমদ কহেন, ‘আমাদের রাজধানী তথা অন্যান্য শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বাংগালী ভদ্রলোকের কথ্য ভাষাই হইবে আমাদের সাহিত্যের ভাষা। তাঁরা তাঁদের অফিসে-আদালতে, ক্লাবে-বৈঠকখানায় স্কুলে-কলেজে যে ভাষায় কথা কন, যে-সব শব্দ ও ক্রিয়াপদ যে স্বর-ভংগিতে যে বাক-প্রণালীতে ব্যবহার করেন সেইটাই হইবে আমাদের সাহিত্যের ভাষা।’17
হ্যাঁ, অঞ্চলভেদে উচ্চারণে পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্য খারাপ না। আরও ভালো। সাহিত্যের জন্য বৈচিত্র্যই দরকার। রাঁধতে জানলে খিঁচুড়ি বিরিয়ানিকেও হার মানায়।
বাংলাদেশের ভাষার অসাধারণ সব সৃষ্টি আছে। সিলেটি গান, চট্টগ্রামের গান, উত্তরবঙ্গের গান, খুলনার পট গান, না শুনলে তো আমাদের দিনই কাটে না। জামালপুরের জারি, মনসুর হাল্লাজের কিচ্ছা, বিয়ার গীত, ধামাইল, পটের গান, ভাওয়াইয়া গান, ভাটিয়ালি গান, বাউল গান, মুর্শিদি গান, মাজারের গান, আধুনিক গান, ব্যান্ড সঙ্গীত, র্যাপ সঙ্গীত, সিনেমার গান—কোনটা চান? সবই আছে। কিন্তু যতই আমাদের দিল্লি গিলে ফেলতেছিল, ততই আমরা নিজেদের সব হারায়া ফেলতেছিলাম।
সমসাময়িক অনেক লেখক, বিশেষ করে ব্রাত্য রাইসু, ইমরুল হাসান, রিফাত হাসান, রক মনু, জহির হাসান মেলাদিন ধরে এই ভাষা প্রতিষ্ঠার কথা বইলা আসতেছেন, সেই নব্বইয়ের দশক থেকে। ফেসবুক আসার পরে, বিশেষ করে শাপলায় গণহত্যার পরে নতুন কইরা বহু মানুষ একটা কমন বাংলায় লেখার ট্রাই করতেছেন। উনারা আমাদের সামনে যেসব উদাহরণ রাখছেন, উদার মনে তা নিয়া যাচাই বাছাই কইরা গ্রহণ করা দরকার। তাদের প্রত্যেকের ভাষা আলাদা। স্টাইল আলাদা। কারো সাথে কারো ভাষা মেলে না। এইখানেই মজা।
আপনিও লেখেন। আপনার ভাষাতে। আপনার মায়ের মুখের ভাষাতে। যে পার্থক্য ধরা পড়বে, ওইটাই আসল। ওইটাই দরকার আমাদের। এইগুলার সমষ্টি একটা বিরাট পার্থক্য তৈরি করবে। এবং পার্থক্যগুলা তৈরি হবে চর্চা করতে করতেই। নতুন লেখকরা গোড়াতেই ২টা গলদ করে। এক. একদল খুব ভালো লেখক এইটার প্রমাণ দিতে অভিধান ঘাইটা অথবা অন্য লেখকদের অনুকরণ কইরা অপ্রচলিত যতসব সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করে। দুই. আরেকদল ঈমানী জোশে দেদারসে অপ্রচলিত আরবি ফার্সি শব্দ আমদানি করে।
এই ২টা কাজই বাজে। আপনাকে যা করতে হবে—সবাই বোঝে, সেইটা যে ভাষার শব্দই হোক, সেইসব শব্দ ব্যবহার করতে হবে। এইটা সাহিত্যের মৌলিক চাওয়া। এই জিনিস বঙ্কিম বুঝতে পারছিল। তার প্রথমদিকের কাজ দুর্গেশনন্দিনীর ভাষা আর শেষের দিকের কাজ দেবী দুর্গারাণীর ভাষা দেখেন, তাইলে পার্থক্যটা বুঝবেন।
বঙ্কিমের প্রবন্ধ থেকে উদাহরণ:
সাহিত্য কি জন্য? গ্রন্থ কি জন্য ? যে পড়িবে, তাহার বুঝিবার জন্য। না বুঝিয়া, বহি বন্ধ করিয়া, পাঠক ত্রাহি ত্রাহি করিয়া ডাকিবে, বোধ হয় এ উদ্দেশ্যে কেহ গ্রন্থ লিখে না। যদি এ কথা সত্য হয়, তবে যে ভাষা সকলের বোধগম্য—অথবা যদি সকলের বোধগম্য কোন ভাষা না থাকে, তবে যে ভাষা অধিকাংশ লোকের বোধগম্য—তাহাতেই গ্রন্থ প্রণীত হওয়া উচিত। যদি কোন লেখকের এমন উদ্দেশ্য থাকে যে, আমার গ্রন্থ দুই চারি জন শব্দপণ্ডিতে বুঝুক, আর কাহারও বুঝিবার প্রয়োজন নাই, তবে তিনি গিয়া দুরূহ ভাষায় গ্রন্থপ্রণয়নে প্রবৃত্ত হউন। যে তাঁহার যশ করে করুক, আমরা কখন যশ করিব না। … রচনার প্রধান গুণ এবং প্রথম প্রয়োজন, সরলতা এবং স্পষ্টতা। যে রচনা সকলেই বুঝিতে পারে, এবং পড়িবামাত্র যাহার অর্থ বুঝা যায়, অর্থগৌরব থাকিলে তাহাই সর্ব্বোৎকৃষ্ট রচনা। তাহার পর ভাষার সৌন্দর্য্য, সরলতা এবং স্পষ্টতার সহিত সৌন্দর্য্য মিশাইতে হইবে। অনেক রচনার মুখ্য উদ্দেশ্য সৌন্দর্য—সে স্থলে সৌন্দর্য্যের অনুরোধে শব্দের একটু অসাধারণতা সহ্য করিতে হয়। … বলিবার কথাগুলি পরিস্ফুট করিয়া বলিতে হইবে—যতটুকু বলিবার আছে, সবটুকু বলিবে—তজ্জন্য ইংরেজি ফার্সি, আর্বি, সংস্কৃত, গ্রাম্য, বন্য, যে ভাষার শব্দ প্রয়োজন, তাহা গ্রহণ করিবে, অশ্লীল ভিন্ন কাহাকেও ছাড়িবে না। তার পর সেই রচনাকে সৌন্দর্য্যবিশিষ্ট করিবে—কেন না, যাহা অসুন্দর, মনুষ্যচিত্তের উপরে তাহার শক্তি অল্প।18
ভাষায় সংস্কৃত শব্দের বেহুদা ব্যবহার নিয়া মজার একটা তথ্য দিছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী:
আমাদের এক পুরুষপূর্ব্বে লোকের সংস্কার এই ছিল যে, চলিত শব্দ পুস্তকে ব্যবহার করিলে সে পুস্তকের গৌরব থাকে না। সেই জন্য তাঁহারা বরফের পরিবর্তে তুষার, ফোয়ারার পরিবর্তে প্রস্রবণ, ঘূর্ণীর পরিবর্তে আবর্ত্ত, গ্রীষ্মের পরিবর্তে নিদাঘ প্রভৃতি আভাঙ্গা সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করিয়া, গ্রন্থের গৌরবরক্ষা করিতেন। অনেক সময়ে তাঁহাদের ব্যবহৃত সংস্কৃত শব্দ সংস্কৃতেও তত চলিত নহে, কেবল সংস্কৃত অভিধানে দেখিতে পাওয়া যায় মাত্র। ভট্টাচার্য্যদিগের মধ্যে যে সকল সংস্কৃত শব্দ প্রচলিত ছিল, তাহা গ্রন্থকারের জানিতেন না, সুতরাং তাঁহাদের গ্রন্থে সে সকল কথা মিলেও না। শুনিয়াছি গ্রন্থকারদিগের মধ্যে দুই পাঁচ জন হয়, একখানি অভিধান, না হয় একজন পণ্ডিত সঙ্গে লইয়া লিখিতে বসিতেন।19
ঔদ্ধত্য, হিংস্রতা মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়। ভালোবাসা মানুষকে কাছে টানে। শিল্প সাহিত্যের একটা প্রধান কাজ মানুষকে দরদী বানায়া তোলা। অতীতের ভুল দোহরানো যাবে না। শত বছর আগে মোল্লা মৌলভীদের অতিরিক্ত আরবি ফার্সি ব্যবহারের কারণে যে বদনাম হইছে তা যেন না হয়। শিল্পীদেরকে স্বাধীনতা দিতে হবে। একদিকে শিল্পীদের স্বাধীনতা হরণ করে, তার রচনার মুখ বন্ধ করা, আবার যখন মুসলমানের শিল্প সাহিত্য হয় না, তখন আফসোস করা, যে কলকাতা তো কালচার দখল কইরা ফেলছে বলা—বালসুলভ আচরণ করা যাবে না। মনের উদারতা বহুত জরুরি। শিল্পের জন্য তো অবশ্যই এমনকি আপনার কাজের জন্যও। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলতেছেন,
মুসলমানের ধর্ম দেশগত বা জাতিগত ধৰ্ম্ম নহে। তাহা সার্বজনীন ধৰ্ম্ম। মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য তাহার ধৰ্ম্ম তাহার প্রতিবেশীকে বুঝাইয়া দেওয়া। সাহিত্যের ভিতর দিয়া আমাদিগকে ইসলামের মহত্ব, ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব, ইস্লামের সৌন্দর্য্য প্রচার করিতে হইবে। এ কথা অস্বীকার করিবার জো নাই যে বাঙ্গালী হিন্দু মুসলমান ধৰ্ম্ম অপেক্ষা খ্রীষ্টান ধর্ম্মের অধিক পক্ষপাতী। সে কি খ্রীষ্টান ইংরেজী সাহিত্যের প্রভাবে নহে? প্রচারের উদ্দেশ্যে আমাদিগকে আমাদিগের প্রতিবেশীর ভাষা গ্রহণ করিতে হইবে। যে ভাষা তাঁহাদিগের মর্ম্ম স্পর্শ করে, সেই ভাষা ব্যবহার করিতে হইবে। হিন্দুর ভাষায় ইসলামী ভাব ফুটাইতে হইবে। কবি কি সুন্দর বলিয়াছেন—
“মুখন কয বহরে দী গোঈ চে ইব্রানী চে সুরিয়ানী।
মকাঁ ময বহরে হক জোঈ যে জাবল্কা চে জাবল্সা।।”
হস্মের তরে আছে সব বাণী, কি বা সে হি কিবা সুরিয়ানী।
সত্যের তরে খোঁজ সব ঠাই, পূর্ব্ব পশ্চিম কোন ভেদ নাই।
মুসলমানী বাংলার কটমট বুলি বাংলার হিন্দুর কানে স্থান পাইবে না, অন্তরে ত নয়ই। খোদা, পয়গম্বর, বেহেশত, দোযখ, ফেরেশতা, নমায, রোযা প্রভৃতি পারসী শব্দ ব্যবহার করিতে যদি আপত্তি না থাকে, তবে ঈশ্বর, স্বর্গ, নরক, উপাসনা, উপবাস প্রভৃতি শব্দ ব্যবহারে আপত্তি কেন? পানি, চাচা, নানা, দাদা, ফুফু প্রভৃতি শব্দগুলি ত হিন্দী বা রাজপুতানী। ইহাদের জন্য এত মারামারি কেন?20
প্রস্তাব
১৯৫৮ সালেই আবুল মনসুর আহমদ এই প্রস্তাব রাখছিলেন, ‘যে-সব বিদেশী শব্দ আমাদের কথাবার্তায় চলিয়া গিয়াছে, সেগুলি অকতারে বই-পুস্তকে ও গোটা সাহিত্যে চালু করিয়া দেওয়া উচিত। আমাদের স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা এবং অফিস-আদালতের অফিসাররা তাঁদের যাঁর-তাঁর এলাকায় কথা বলিবার সময় যে-সব বিদেশী শব্দ ব্যবহার করেন, লিখিবার সময়ও বাংলা হরফে সেইসব শব্দ ব্যবহার করিবেন। এতে গৌরব হানি হইবে না। ভাষার বিন্দুমাত্র অবনতি ঘটিবে না। বরঞ্চ তাতে আমাদের ভাষার শব্দ-সম্পদ বাড়িয়া যাইবে। এই ইলাস্টিসিটি ভাষাকে দ্রুত আধুনিক বৈজ্ঞানিক ভাষায় পরিণত করিবে।’
আমি আরও কিছু কথা যোগ করতে চাই।
- বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা সাহিত্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করতে হবে। পরে সবার ভেতরে যখন এইটার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে, তখন রাষ্ট্রীয় কাজেও ব্যবহার করতে হবে। বিভিন্ন বিভাগে তাদের ভাষাতেই কাজ চালানো হবে।
- আপনারা যারা দিল্লির আধিপত্য থেকে বের হইতে চান, তাদের সবার আগে কলকাতার আধিপত্য থেকে বের হইতে হবে। রবীন্দ্রনাথকে কলকাতার বাহিত দিল্লির আধিপত্য হিসাবে রিড করতে পারা জরুরি। কলিকাতার আধিপত্য থেকে বের হইতে হইলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তথা কলকাতার যাবতীয় লেখকদের প্রেম থেকে বের হইতে হবে।
- মুসলমানী বাঙ্গলা এবং হিন্দুয়ানি বাংলা কোনোটাকেই আমরা পুরাপুরি বিদায় দিতে চাই না। সব ভাষারেই স্বাগতম জানাইতে চাই। কিন্তু স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জনমানুষের মুখের ভাষারে বাংলা ভাষার ইমাম মাইনা অন্যান্য ভাষারেও গুরুত্ব সহকারে চর্চা করব, সাহিত্যের ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিব।
শেষ কথা
গল্প লিখতে গিয়া আমি টের পাইছিলাম, আমাদের নিজস্ব কালচারের বিকাশ এবং নিজস্ব সাহিত্য সৃষ্টির জন্য প্রচলিত মান ভাষাটা যথেষ্ট না। কলকাতার ভাষায় দম নিতে আমার কষ্ট হইতেছে। ফলে আমি নিজের মুখের ভাষায় লেখা শুরু করছিলাম। আমার শেষ ২টা বইয়ে আমি কলকাতার তথাকথিত প্রমিত ভাষাকে সযত্নে এড়ায়া গেছি।
আমরা কোনোভাবেই কলকাতার ভাষার অমঙ্গল চাই না। আমরা চাই সেই ভাষার আরও উন্নতি হোক। কলকাতার আঞ্চলিক বাংলা ভাষা সারাভারতের ভাষা হয়ে উঠুক। আমরা তখন কলকাতার আঞ্চলিক বাংলা ভাষার জয়গান গাব। কিন্তু ভারতের পশ্চিম বঙ্গের ভাষা আমি কোনোভাবেই একমাত্র আদর্শ ভাষা এবং নিজের ভাষা বলে মেনে নিব না। সেই ভাষায় বিশ্বকবি হোক, বিশ্বলেখক হোক, কোনো অসুবিধা নাই। ওই ভাষা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ভাষা হতে পারে না। আলাদা দেশ হওয়ায় ওইটা এখন বিদেশী ভাষা হিসাবেই গণ্য করব। বিদেশী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররা তার কলকাতার ভাষা আমার ওপর চাপায়া দিয়া, আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়। সেইটা আমরা হইতে দিব না। আমরা আমাদের মায়েদের মুখের ভাষায় সাহিত্য চর্চা করব।
তথ্যসূত্র
- আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। বাংলা ভাশা সিরিজ ২। ঢাকা: বাছবিচার বুকস, ২০২২।
- আবদুল হাই, মুহাম্মদ ও সৈয়দ আলী আহসান। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত। ঢাকা: আহমদ পাবলিশিং হাউস, একাদশ মুদ্রণ, ২০১০।
- আবদুর রহিম, শেখ। শেখ আবদুর রহিম গ্রন্থাবলী, প্রথম খণ্ড। ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৬৫।
- আহমদ, আবুল মনসুর। বাংলাদেশের কালচার। ঢাকা: আহমদ পাবলিশিং হাউস, দশম মুদ্রণ, ২০২৪।
- চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র। বিবিধ প্রবন্ধ। কলকাতা: বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, ১৯৩৯।
- চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র। ‘বাঙ্গালা ভাষা, লিখিবার ভাষা’। কলকাতা: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বিবিধ প্রবন্ধ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, ১৯৩৯।
- চৌধুরী, নীরদচন্দ্র। আমার দেবোত্তর সম্পত্তি। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ষষ্ঠ মুদ্রণ, ২০১৩।
- ছফা, আহমদ। আহমদ ছফা রচনাবলী, ৪র্থ খণ্ড। ঢাকা: খান ব্রাদার্স।
- দাস, সজনীকান্ত। আত্মস্মৃতি। কলকাতা: সুবর্ণরেখা, ১৯৫৪।
- ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। বাংলাভাষা পরিচয়। কলকাতা: বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ১৯৩৮।
- মেহেরুল্লাহ, মুনশী মোহাম্মদ। তর্ক। ঢাকা: বাছবিচার বুকস, ২০২৪।
- মশাররফ হোসেন, মীর। বিষাদসিন্ধু। ঢাকা: বাংলা একাডেমি, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ২০২০।
- শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ। রচনা সংগ্রহ, ২য় খণ্ড। কলকাতা: নাথ ব্রাদার্স, ১৯৮১।
- শহীদুল্লাহ, মুহাম্মদ। আমাদের ভাষাসমস্যা। ঢাকা: বাছবিচার বুকস, ২০২৪।
- শহীদুল্লাহ, মুহাম্মদ। শহীদুল্লাহ রচনাবলী। ভাষা ও সাহিত্য। ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০২৪।
- সেন, দীনেশচন্দ্র। ময়মনসিংহ গীতিকা। কলকাতা: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯২৩।
- Al-Attas, Syed Muhammad Naquib. Prolegomena to the Metaphysics of Islam, Kuala Lumpur: ISTAC, 1995.
- Gramsci, Antonio. Selections from the Prison Notebooks. Edited and translated by Quintin Hoare and Geoffrey Nowell Smith. New York: International Publishers, 1971
- Said, Edward W. (1978). Orientalism. New York: Pantheon Books.
- Said, Edward W. (1993). Culture and Imperialism. New York: Vintage Books / Knopf.
পাদটীকা
- আবুল মনসুর আহমদ। বাংলাদেশের কালচার, আহমদ পাবলিশিং হাউস, দশম মুদ্রণ, ২০২৪। ↩︎
- শহীদুল্লাহ, মুহাম্মদ। শহীদুল্লাহ রচনাবলী। ভাষা ও সাহিত্য। ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০২৪। ↩︎
- ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। আমাদের ভাষাসমস্যা, বাছবিচার বুকস, ২০২৪। ↩︎
- শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ। রচনা সংগ্রহ, ২য় খণ্ড। কলকাতা: নাথ ব্রাদার্স, ১৯৮১। ↩︎
- বাঙ্গালা ভাষা, লিখিবার ভাষা : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ↩︎
- শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ। রচনা সংগ্রহ, ২য় খণ্ড। কলকাতা: নাথ ব্রাদার্স, ১৯৮১। ↩︎
- মুনশী মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ। তর্ক, বাছবিচার বুকস, ২০২৪। ↩︎
- শেখ আবদুর রহিম গ্রন্থাবলী। প্রথম খণ্ড। বাংলা একাডেমি, ১৯৬৫। ↩︎
- ঐ ↩︎
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলাভাষা পরিচয়। বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়, ১৯৩৮। ↩︎
- Said, Edward W. (1978). Orientalism. New York: Pantheon Books. ↩︎
- Gramsci, A. (1971). Selections from Prison Notebook. New York: International Publishers ↩︎
- আহমদ ছফা। রচনাবলী ৪ র্থ খণ্ড। খান ব্রাদার্স। ↩︎
- Edward W. Said, Culture and Imperialism (1993). ↩︎
- আমি দুইটাকে অভিন্ন ঘটনা বলতেছি না; বরং দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় আধিপত্য আর অদৃশ্য সাংস্কৃতিক আধিপত্যের পার্থক্যটা বোঝাইতে তুলনাটা টানতেছি। ↩︎
- Syed Muhammad Naquib al-Attas, Prolegomena to the Metaphysics of Islam, Kuala Lumpur: ISTAC, 1995. ↩︎
- ঐ ↩︎
- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বিবিধ প্রবন্ধ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, ১৯৩৯। ↩︎
- ঐ ↩︎
- ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। আমাদের ভাষাসমস্যা, বাছবিচার বুকস, ২০২৪। ↩︎