আমার এক প্রতিবেশী, প্রতিদিন সকাল এগারোটায় ঘুম থেকে ওঠেন, ল্যাপটপ খোলেন, আর তারপর সারাদিন এক রহস্যময় টাইমজোনের ক্লায়েন্টের সঙ্গে যুদ্ধ করেন যাকে তিনি কোনোদিন দেখেননি, যার গলার স্বরও শোনেননি, শুধু চেনেন একটা প্রোফাইল ছবি আর কয়েকটা মেসেজের ভাষা দিয়ে। প্রতিবেশী রফিক নিজেকে পরিচয় দেন “স্বাধীন পেশাজীবী” হিসেবে। পরিবার তাকে বলে “ফ্রি ল্যান্সিং করে।” আর তার মা মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করেন, “তুই আসলে করিসটা কী?”
এই প্রশ্নটার সোজাসুজি কোন উত্তর নাই। কারণ উত্তরটা হ্যাঁ-ও না, আবার না-ও না।
যে স্বাধীনতার দাম একাকীত্ব
ফ্রিল্যান্সিং শব্দটার সঙ্গে যে রোমান্টিক ছবিটা জুড়ে দেওয়া হয়: বালিতে বসে ল্যাপটপ, নারকেলের জুস হাতে, কোনো বস নেই, কোনো নয়টা-পাঁচটা নেই। সেই ছবিটা বিজ্ঞাপনদাতাদের তৈরি, বাস্তবতার না। বাস্তবতা অনেক বেশি নিঃসঙ্গ, এবং অনেক বেশি গবেষণার বিষয়ও বটে।
কানাডার তিনজন সমাজবিজ্ঞানী: ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের পল গ্ল্যাভিন, ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালেক্স বিয়ারম্যান আর টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কট শিম্যান —প্রায় পাঁচ হাজার কর্মীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখেছেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করা মানুষদের মধ্যে ক্ষমতাহীনতা আর একাকীত্বের অনুভূতি প্রথাগত চাকরিজীবীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, আর এই পার্থক্যটা শুধু আর্থিক অনিশ্চয়তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মানে টাকার অভাব না, সমস্যাটা গভীরতর আরকি। মানুষের কাঠামোগত একাকীত্ব। একটা জাতীয় জরিপভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, গিগ ওয়ার্কারদের মানসিক স্বাস্থ্য আর জীবন-সন্তুষ্টি পূর্ণকালীন বা খণ্ডকালীন কর্মীদের চেয়ে খারাপ, এবং এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে একাকীত্ব ও আর্থিক অনিশ্চয়তা। যদিও বেকারদের চেয়ে তারা ভালো অবস্থায় আছেন, এইটুকুই যা সান্ত্বনা।
নোট করেন যে, অফিসে কাজ করার সময় সর্বদাই ঘটে সেই ঘটনাগুলো কী: করিডোরে কারো সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া, লাঞ্চ ব্রেকের আড্ডা, মিটিংয়ের আগে পাঁচ মিনিটের খোশগল্প। এগুলোই আসলে মানুষকে মানসিকভাবে সুস্থ রাখে। ফ্রিল্যান্সারের জীবনে এসবের কিছুই নাই। আছে শুধু একটা স্ক্রিন, একটা ডেডলাইন, আর একটা রেটিং সিস্টেম যা প্রতিটা কাজের পর আপনাকে বিচার করে, ঠিক যেন স্কুলের রিপোর্ট কার্ডের মতো। কিন্তু জটিলতা হচ্ছে এই স্কুল কখনো শেষই হয় না।
ফ্রিল্যান্সার
বাংলাদেশের প্রসঙ্গে সংখ্যা ছাড়া কথা বলা একরকম অসম্ভব। এই দেশটাই তো পরিসংখ্যানের ওপর গর্ব করতে ভালোবাসে। আইসিটি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে সক্রিয় ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা প্রায় ছয় লাখ পঞ্চাশ হাজার, যারা বছরে পাঁচশো মিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেন। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, অনলাইন শ্রমের জোগানে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়, ভারতের ঠিক পরেই, বিশ্বের অনলাইন শ্রমবাজারের প্রায় ষোলো শতাংশ একাই সরবরাহ করছে এই দেশ।
কিন্তু এখানে একটা ফাঁক আছে। পেওনিয়ারের তথ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দশ ফ্রিল্যান্সিং দেশের মধ্যে অষ্টম স্থানে। সংখ্যায় ভালো, আয়ে মাঝারি। অথচ সিইওওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের আরেকটা প্রতিবেদনে ফ্রিল্যান্সার নিয়োগের উপযুক্ততার বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান ত্রিশটি দেশের মধ্যে ঊনত্রিশতম। এই দুটো পরিসংখ্যান পাশাপাশি রাখলে একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়ায়। আমরা সংখ্যায় বিশাল, কিন্তু গুণগত মানে এখনও তলানির কাছাকাছি কেন?
নতুন পোশাকে পুরনো ভুত
আসলে “একলা কাজ করা মানুষের একাকীত্ব” নতুন কোনো আবিষ্কার না। উনিশ শতকের শিল্প বিপ্লবের সময় কার্ল মার্ক্স যে “বিচ্ছিন্নতা” বা alienation-এর কথা বলেছিলেন, শ্রমিক তার শ্রমের ফল থেকে, তার সহকর্মীদের থেকে, এমনকি নিজের কাজের প্রক্রিয়া থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেই তত্ত্বটাকেই আজকের গবেষকরা গিগ অর্থনীতির ব্যাখ্যায় টেনে এনেছেন। মার্ক্সের কারখানার বদলে এখন আছে অ্যালগরিদম, যে বস হয়ে বসে আছে স্ক্রিনের ভেতরে, কোনো মুখ নেই যার, কোনো অফিস নেই যেখানে গিয়ে অভিযোগ জানানো যায়।
আসলে, বাজার দ্রুত স্যাচুরেটেড হয়ে যাচ্ছে, অথচ দক্ষতা আর মানসিকতার দিক থেকে প্রস্তুতি সেই হারে বাড়ছে না। লাখ লাখ মানুষ ঢুকছেন এই খাতে, কিন্তু “ফ্রিল্যান্সার” শব্দটার পেছনে প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান আর পেশাদারিত্বের যে স্তর থাকা দরকার, সেটা সবার নেই। ফলাফল: রেট কমে যাচ্ছে, প্রতিযোগিতা বাড়ছে, আর গড় আয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বিস্ময়করভাবে কমছে।
আয়ের কথা যখন উঠলই তো এই বিষয়টা আরেকটু ভিতর থেকে দেখা প্রয়োজন। পেওনিয়ার-এর মতে, ২০২৫ সালে একজন গড়পড়তা বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সার মাসে পাঁচশো থেকে সাতশো ডলার আয় করেছেন, যেখানে দেশের একজন এন্ট্রি-লেভেল কর্পোরেট কর্মীর গড় বেতন একশো থেকে একশো পনেরো ডলারের আশেপাশে। সংখ্যা দিয়ে দেখলে ফ্রিল্যান্সিং স্পষ্টতই জিতে যাচ্ছে। আর এই হিসাবটাই হয়তো আমাদের সামনে তুলে ধরে, কেন দেশের পঁয়ষট্টি শতাংশের বেশি তরুণ জনসংখ্যা এই পথে হাঁটছে। আনুষ্ঠানিক চাকরির বাজারে যথেষ্ট পদ নেই, স্বজনপ্রীতির দাপট আছে, আর ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন দুই-তিন ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকার বিনিময়ে বেতন পাওয়া যা পাওয়া যায়, সেটাও যথেষ্ট নয়।
উনিশ শতকে শ্রমিক অন্তত কারখানার মেঝেতে পাশের মানুষটাকে দেখতে পেতেন, একসঙ্গে চা খেতেন, প্রয়োজনে একসঙ্গে রুখে দাঁড়াতেও পারতেন। ফ্রিল্যান্সারের সেই সুযোগও নাই। তার ইউনিয়ন নাই, তার সহকর্মী নাই, আছে শুধু একটা প্রোফাইল পেজ আর কিছু তারার রেটিং।
স্বাধীনতা মানে কি তাহলে এই! একা একা, নিজের ঘরে বসে, নিজেরই কর্পোরেট মালিক আর নিজেরই একমাত্র কর্মচারী হয়ে যাওয়া?
সরকারি খাতার পাতায়
সরকারি নথিপত্র অবশ্য একটু অন্য গল্প বলে। আশাবাদী, পরিসংখ্যানভারাক্রান্ত গল্প। আইসিটি বিভাগের লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (এলইডিপি) প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে ৩৭৩ কোটি ৭৭ লাখ ২৩ হাজার টাকা ব্যয়ে ৩৬ হাজার জনকে প্রশিক্ষণ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি এই কার্যক্রম শুরু হয়।
আর প্রশাসনিক স্বীকৃতির দিক থেকেও বদল এসেছে। ২০২০ সালে “ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড” শুরু করা হয়েছে। এখন তো বিভিন্ন ব্যাংকও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সুবিধা দিচ্ছে, যাতে বৈদেশিক মুদ্রা সহজে শনাক্ত আর প্রক্রিয়াকৃত করার পর ফ্রিল্যান্সারের হাতে পৌঁছানো যায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) এই আয়কে পেশাগত আয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যার অর্থ “স্বাধীন” পেশাজীবীকেও কর দিতে হয়, ঠিক যেমন বাকি সবাইকে হয়। স্বাধীনতার সংজ্ঞায় বোধহয় এটাও যোগ করা দরকার, কর দেওয়ার স্বাধীনতাও স্বাধীনতারই অংশ।
প্রশ্নটা ছিল, স্বাধীনতা নাকি একা একা কর্পোরেট হওয়া? সৎ উত্তর হলো, দুটোই, একসঙ্গে, একই সময়ে। যে তরুণ ঢাকার অফিসপাড়ায় চাকরির জন্য বছরের পর বছর সিভি জমা দিয়েও ডাক পান না, তার কাছে ফ্রিল্যান্সিং নিঃসন্দেহে মুক্তি। নিজের সময়, নিজের রেট, নিজের ক্লায়েন্ট বেছে নেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু সেই একই তরুণ যখন রাত বারোটায় একটা মার্কিন ক্লায়েন্টের সঙ্গে ভিডিও কলে বসেন, আর কল শেষে ঘরের নিস্তব্ধতায় ফিরে আসেন, তখন বোঝা যায়। স্বাধীনতার একটা মূল্য আছে, আর সেই মূল্যটা প্রায়ই শোধ হয় একাকীত্বের মুদ্রায়।
হয়তো আসল প্রশ্নটা “স্বাধীনতা না বিচ্ছিন্নতা” এই দ্বিত্বে আটকে নেই। আসল প্রশ্নটা হলো, আমরা কি এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করতে পারব, যেখানে স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে একটা কমিউনিটিও। যেখানে ফ্রিল্যান্সাররা একে অপরকে চিনবেন, একসঙ্গে বসবেন, একসঙ্গে লড়বেন? নইলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যানে বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা ফ্রিল্যান্সিং দেশ হয়েও, ব্যক্তি পর্যায়ে থেকে যাবে ছয় লাখ পঞ্চাশ হাজার নিঃসঙ্গ স্ক্রিনের সমষ্টি মাত্র। প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্ক্রিনে আলাদা, প্রত্যেকেই নিজের ডেডলাইনে বন্দি, আর প্রত্যেকেই, কাগজে-কলমে অন্তত, স্বাধীন।