একজন নজরুল, অনেক পৃথিবী

নজরুল আজ সর্বত্র উপস্থিত, কিন্তু তাঁর প্রকৃত পাঠ যেন ক্রমেই অনুপস্থিত।

● মরতুজা রশিদ

আগস্ট ২৭, ২০২৬

একজন নজরুল, অনেক পৃথিবী The Publish

ইলাস্ট্রেশন : দ্য পাবলিশ / ছবি : পা. ডো.


১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র সকাল, তখন ঘড়িতে দশটা দশ। ঢাকার তদানীন্তন পিজি হাসপাতালের একটি কেবিনে একজন বৃদ্ধ মানুষ শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন। সাতাত্তর বছর বয়স, শরীর অশক্ত। এই মানুষটির নাম কাজী নজরুল ইসলাম। যে মানুষটি একদিন কলকাতার রাস্তায় শব্দ দিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, শেষ চৌত্রিশ বছর তিনি কার্যত কথাই বলতে পারেননি। ১৯৪২ সালের ১০ অক্টোবর, মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে, মস্তিষ্কের এক বিরল ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন, চিকিৎসকদের ভাষায় যাকে বলা হয় পিকস ডিজিজ। যে মুখ থেকে একসময় হাজার হাজার শ্রোতার সামনে গর্জে উঠত কবিতা, সেই মুখ শেষ তিন দশকেরও বেশি সময় শুধু তাকিয়ে থাকত। যে মানুষ সারাজীবন শব্দকেই অস্ত্র বানিয়েছিলেন, ভাগ্যের নিষ্ঠুর রসিকতায় কেড়ে নেওয়া হলো তার সেই অস্ত্র। আজ, তাঁর মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পূর্তির প্রাক্কালে, প্রশ্নটা তাই কেবল স্মরণসভার না। প্রশ্নটা হলো, আমরা আসলে কাকে স্মরণ করছি?

১৮৯৯ সালের ২৪ মে, তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নিলেন এক শিশু, যাঁর ডাকনাম রাখা হলো দুখু মিয়া। তাঁর বাবা কাজী ফকির আহমদ স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মোয়াজ্জিন ছিলেন, মা জাহেদা খাতুন। এই দম্পতির আগের চার সন্তান শৈশবেই মারা গিয়েছিল, তাই পরের সন্তানের নামকরণেও যেন সেই শোকের ছায়া পড়ল। চুরুলিয়ায় নজরুলের পরিবার সম্পর্কে একটি প্রবাদ চালু ছিল, কাজী বাড়ির বিড়াল পর্যন্ত নাকি অন্তত তিনটি পাঠ জানে, এমন এক ধর্মশিক্ষিত পরিবারের কথা বোঝাতে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল অনেক কঠোর। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারে দারিদ্র্য এমন তীব্র হয়ে ওঠে যে শিশু নজরুলকে মক্তবে পড়াশোনার পাশাপাশি রুটির দোকানে কাজ করতে হয়, এমনকি আসানসোলের এক বেকারিতেও তিনি রুটি বানিয়েছেন এক সময়। এই ঘটনা আপনাকে এটি বুঝতে সাহায্য করবে যে, কেন পরবর্তী জীবনে শ্রমজীবী মানুষ, ক্ষুধা আর বঞ্চনা তাঁর কবিতায় এত সহজাতভাবে ফিরে ফিরে আসে। তিনি এসব বিষয়ে গবেষণা করেন নাই, তিনি এসব পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে গিয়েছিলেন।

মসজিদ আর মক্তবের ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি প্রায় দশ বছর বয়সে নজরুল যোগ দেন গ্রামীণ লেটো দলে, লোকনাট্য আর গানের এক ভ্রাম্যমাণ সংস্কৃতিতে, যেখানে হাসি-ঠাট্টা, পুরাণ আর ধর্মীয় কাহিনি থাকত এক মঞ্চে। এখানেই সম্ভবত প্রথম নজরুলের ভেতরে সেই অভ্যাসটি গড়ে ওঠে, যা তাঁকে সারাজীবন আলাদা করে রাখে। একই সঙ্গে একাধিক জগতে বাস করার অভ্যাস। ইসলামি সংস্কৃতি আর হিন্দু পুরাণ, উঁচু সাহিত্য আর লোকজ রসিকতা, ভক্তি আর বিদ্রুপ, এসব তাঁর কাছে কখনও পরস্পরবিরোধী মনে হয় নাই।

এক সৈনিক খুঁজে পান তার কণ্ঠস্বর

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বছরগুলোয়, ১৯১৭ সালে, তরুণ নজরুল যোগ দেন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে। যে মানুষ পরে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে তীব্র কণ্ঠ হয়ে উঠেন, তিনিই তরুণ বয়সে সেই একই সাম্রাজ্যের উর্দিতে কাজ করেছিলেন। এই ঘটনাই তাঁর জীবনের প্রথম বড় দ্বন্দ্ব, যা পরবর্তী সব দ্বন্দ্বের পূর্বাভাস দেয়।

সেনাবাহিনীতে করাচি অঞ্চলে কাটানো সময়ে নজরুল ফারসি সাহিত্য আর সুফি কবিতার সংস্পর্শে আসেন, যা তাঁর পরবর্তী কাব্যভাষাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। যুদ্ধ শেষে কলকাতায় ফিরে তিনি ওঠেন বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে, ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে, যেখানে তাঁর সহবাসী ছিলেন সমিতির কর্মকর্তা মুজফ্‌ফর আহমদ। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর সাহিত্য-সাংবাদিকতার জীবন। মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনার মতো পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর লেখা। নজরুলের প্রথম কবিতা “মুক্তি” প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালে। কলকাতা তখন এক উত্তাল শহর। অসহযোগ আন্দোলন সবে শেষ হয়েছে, খিলাফত আন্দোলনের রাজনীতি তুঙ্গে, আর সাহিত্যের জগতে রবীন্দ্রনাথের প্রবল ছায়ার নিচে নতুন এক ভাষা খুঁজছিলেন তরুণ লেখকেরা। এই পরিবেশেই নজরুল লিখতে শুরু করেন এমন এক কবিতা, যা পরে বাংলা সাহিত্যের গতিপথই বদলে দেয়।

১৯২১ সালে লেখা এবং পরের বছর প্রকাশিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নিয়ে এত কিছু বলা হয়েছে যে তার আসল রাজনৈতিক শক্তিটাই অনেক সময় হারিয়ে যায় স্তুতির ভিড়ে। এই কবিতা কোনো বিমূর্ত দার্শনিক উচ্চারণ ছিল না। এটি লেখা হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকা একটি জাতি নিজেকে ক্রমাগত হীন, অসহায় আর পরাধীন হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে একজন তরুণ কবি ঘোষণা করলেন, তিনি কোনো শক্তির কাছেই মাথা নোয়াবেন না, এমনকি ঈশ্বরের কাছেও না। এই আত্মবিশ্বাসের ঘোষণা সেই মুহূর্তে ছিল রাজনৈতিকভাবে বিস্ফোরক, কারণ এটি ঔপনিবেশিক ক্ষমতার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিটাকেই আঘাত করেছিল, যে ভিত্তি দাঁড়িয়ে ছিল শাসিতের হীনম্মন্যতার ওপর।

কবিতাটি প্রকাশের পর সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে যে সাড়া পড়ে, তা নজরুলকে রাতারাতি এনে দেয় ‘বিদ্রোহী কবি’ উপাধি। কিন্তু ঠিক এখানেই প্রথম প্রশ্নটা তোলা দরকার। এই বিদ্রোহ আসলে কার বিরুদ্ধে ছিল? শুধু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে, নাকি তার চেয়ে বৃহত্তর কিছুর বিরুদ্ধে, মানুষের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে এমন সব ধরনের ক্ষমতার বিরুদ্ধে? পরের বছরগুলোতে নজরুলের লেখা এই প্রশ্নের উত্তর দেবে, এবং উত্তরটা মোটেও সরল হবে না।

বহু নজরুল

‘বিদ্রোহী কবি’ তকমাটি এত জোরালো হয়ে উঠেছে যে অনেক সময় নজরুলের বাকি পরিচয়গুলো তার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। অথচ তিনি একই সঙ্গে একাধিক পরস্পরবিরোধী জগতে বাস করতেন, আর সেটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। তিনি  ছিলেন একজন মুসলিম কবি, ধর্মীয় শিক্ষায় বেড়ে ওঠা, ইসলামি গান আর হামদ-নাতের রচয়িতা। অথচ তাঁর সাহিত্য হিন্দু পুরাণে পরিপূর্ণ, কালী, দুর্গা, কৃষ্ণ তাঁর কল্পনায় বারবার ফিরে এসেছে। তিনি একই সঙ্গে লিখেছেন ইসলামি সংগীত এবং শ্যামাসংগীত, দুটি ভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের গান, একই কণ্ঠে, একই আবেগে। এই সহাবস্থান কোনো সুবিধাবাদী কৌশল ছিল না, ছিল তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মবোধেরই প্রতিফলন, যেখানে ধর্মের সারমর্ম ছিল মানবতা, আর আচার সেখানে গৌণ।

তিনি প্রেমের কবি, সেই সঙ্গে বিপ্লবের কবিও। তিনি সাম্যবাদের কবি, শ্রমিক-কৃষকের পক্ষে দাঁড়ানো এক কণ্ঠস্বর, অথচ তাঁর সময়ের প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির কোনো একটি মতাদর্শে তিনি নিজেকে পুরোপুরি বেঁধে ফেলেননি। তিনি নারীর সমানাধিকার আর যৌনতা নিয়ে তাঁর সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সাহসী অবস্থান নিয়েছিলেন, যখন সমাজের বড় অংশ এসব বিষয়ে নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করত। আর সংগীতে তাঁর অবদান প্রায় বিস্ময়কর। প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান রচনা করেছেন তিনি, যা আজ নজরুলগীতি নামে বাংলা সংগীতের এক স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে টিকে আছে। এই বিপুল সৃষ্টিশীলতা ঘটেছিল মাত্র তেইশ বছরের এক সাহিত্যিক জীবনে।

বিপজ্জনক কবি

১৯২২ সালে নজরুল প্রতিষ্ঠা করেন ধূমকেতু পত্রিকা, যা দ্রুতই পরিণত হয় বিপ্লবী রাজনৈতিক চিন্তার একটি কেন্দ্রে। সেই বছরের পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর কবিতা “আনন্দময়ীর আগমনে”, এটি ছিল মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বরাজ ও স্বাধীনতার এক তীব্র রাজনৈতিক আহ্বান। কবিতাটিকে রাজদ্রোহমূলক বিবেচনা করে ১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর ব্রিটিশ সরকার ধূমকেতুর ওই সংখ্যাটি নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত করে। তারপর ২৩ নভেম্বর নজরুলকে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৬ জানুয়ারি ১৯২৩ কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে রাজদ্রোহের অভিযোগে তাঁর বিচার শুরু হয়, আদালতে তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতে দাঁড়িয়ে নজরুল যে বক্তব্য দেন, তা পরে পরিচিত হয় রাজবন্দীর জবানবন্দী নামে, ঔপনিবেশিক আইনি ব্যবস্থার বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা এক রাজনৈতিক দলিল হিসেবে। ব্রিটিশ সরকার শেষ পর্যন্ত তাঁর পাঁচটি গ্রন্থ নিষিদ্ধ করে, বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, প্রলয় শিখা, চন্দ্রবিন্দু আর যুগবাণী। এই তালিকা প্রমাণ করে, ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছে নজরুল কোনো নিছক আবেগপ্রবণ কবি ছিলেন না, ছিলেন প্রকৃত রাজনৈতিক হুমকি।

কারাগারে থাকাকালীন তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মোট ৩৯ দিন অনশন করেন। হুগলি জেলে বন্দীদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি এই ঐতিহাসিক অনশন শুরু করেন। নজরুলের অনশন ভাঙানোর জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর টেলিগ্রাম পাঠান, যেখানে লেখা ছিল: “Give up hunger strike, our literature claims you.”। এই কারাবাসের সময়েই নজরুলকে উৎসর্গ করে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি প্রকাশ করেন।

দীর্ঘ নীরবতা এবং একজন কবি হয়ে ওঠেন এক জাতির প্রতীক

১৯৪২ সালের সেই অক্টোবরের পর যা ঘটে, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অন্যতম করুণ অধ্যায়। কলকাতায় প্রাথমিক চিকিৎসার চেষ্টা হলেও তাঁর অবস্থার উন্নতি হয়নি। যে মানুষ একসময় জনসভায় নিজের কবিতা আবৃত্তি করে শ্রোতাদের উত্তাল করে তুলতেন, তিনি ধীরে ধীরে পরিণত হন নিজের জীবনের একজন নীরব দর্শকে। নজরুল নিরাময় সমিতির চেষ্টায় ১৯৫৩ সালে তাঁকে প্রথমে লন্ডন এবং পরে ভিয়েনায় পাঠানো হয়। সেখানে বিশ্বখ্যাত স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান যে, অনেক দেরি হয়ে গেছে এবং রোগটি নিরাময়ের অযোগ্য। সুদীর্ঘ ৩৪ বছর তিনি সম্পূর্ণ নীরব ও নিষ্ক্রিয় অবস্থায় বেঁচে ছিলেন। একজন কবির কণ্ঠস্বর যদি তাঁর কবিতার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে, তাহলে সেই কণ্ঠস্বর থেমে গেলে কবিতাটা কী থেকে যায়? নজরুলের ক্ষেত্রে উত্তরটা আশ্বস্তকর, কারণ তাঁর কবিতা আর গান তাঁর নীরবতাকে ছাপিয়ে বেঁচে আছে আজও।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে এবং ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে ১৯৭২ সালের ২৪ মে নজরুলকে পরিবারসহ ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। তখন তিনি বাকশক্তিহীন, প্রায় ত্রিশ বছর ধরে নীরব। তবু এই আগমন নিছক একজন অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ঘটনা ছিল না। এটি ছিল গভীরভাবে প্রতীকী এক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্র তখন নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয় খুঁজছিল, এমন এক পরিচয় যা পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ইসলামি জাতীয়তাবাদ থেকে আলাদা, অথচ ভারতের হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকেও স্বতন্ত্র। নজরুলের জীবন আর সাহিত্য এই প্রয়োজন এমনভাবে পূরণ করেছিল, যা আর কোনো কবির পক্ষে সম্ভব ছিল না। একজন মুসলিম কবি, যিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রবক্তা, ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক, শ্রেণিসাম্যের কণ্ঠস্বর, একই সঙ্গে গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরোধী। তাঁর রণসংগীত পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সরকারি সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়, যা তাঁকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের কাঠামোর মধ্যে আরও গভীরভাবে প্রোথিত করে।

কৌতূহলোদ্দীপক একটি তথ্য এখানে উল্লেখযোগ্য। যদিও নজরুলকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছিল ১৯৭২ সাল থেকেই, কিন্তু তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় কবি ঘোষণা করে সরকারি গেজেট জারি হয় আরও অনেক অনেক পরে, ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বরে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে উদ্‌যাপন করেছে, অথচ কাগজে-কলমে সেই স্বীকৃতি আনুষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে মাত্র সাম্প্রতিক অতীতে। এই বিলম্বই যেন এক নীরব রূপক, প্রতীক তৈরি হতে পারে আবেগ দিয়ে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি সবসময় সেই গতিতে আগায় না। নজরুলকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় ১৯৭৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি, তাঁর মৃত্যুর মাত্র ছয় মাস আগে। এতটাই দেরিতে যে প্রশ্ন জাগে, একজন মানুষকে জাতীয় প্রতীক বানাতে আমাদের কতটা তাড়াহুড়ো, আর তাঁকে পূর্ণ নাগরিক মর্যাদা দিতে কতটা দেরি হতে পারে। বিশেষত বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমরা এসমস্ত কাজে একটু বেশিই অলস।

আমরা কি নজরুলকে পড়ি, নাকি শুধু উদ্‌যাপন করি?

আজকের বাংলাদেশে নজরুলের নাম সর্বত্র। সড়কের নাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নাম, স্কুলপাঠ্যের কবিতা। অথচ এই সর্বব্যাপী উপস্থিতির সঙ্গে তাঁর প্রকৃত পাঠের সম্পর্ক প্রায়ই বিচ্ছিন্ন। বেশিরভাগ মানুষ তাঁকে চেনেন কয়েকটি নির্দিষ্ট পঙক্তি আর একটি তকমা দিয়ে, ‘বিদ্রোহী কবি’। কিন্তু যে নজরুল ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সমান তীব্রতায় লিখেছেন, যে নজরুল পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্ন করেছেন, যে নজরুল শ্রেণিবৈষম্যকে আক্রমণ করেছেন, সেই বহুস্তরীয় নজরুলকে আমরা কতটা পড়ি?

আজকের বাংলাদেশে যখন রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র, যখন ধর্মীয় মেরুকরণ নিয়ে বিতর্ক চলছে, যখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন নজরুলের সম্পূর্ণ পরিচয়টাকে সামনে আনা অস্বস্তিকর হতে পারে যেকোনো পক্ষের জন্যই। যাঁরা তাঁকে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতীক বানাতে চান, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর তাঁর হিন্দু পুরাণনির্ভর সাহিত্য আর শ্যামাসংগীত রচনা। যাঁরা তাঁকে কেবল ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীলতার প্রতীক বানাতে চান, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর তাঁর গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস আর ইসলামি সংগীতের বিপুল সৃষ্টিকর্ম। যাঁরা তাঁকে রাষ্ট্রীয় প্রতীকে পরিণত করতে চান, তাঁদের জন্য অস্বস্তিকর তাঁর ক্ষমতাবিরোধী, প্রাতিষ্ঠানিকতাবিরোধী চিরকালীন মনোভাব।

তাই প্রশ্নটা বদলানো দরকার। নজরুল আজ বেঁচে থাকলে কী বলতেন, এই প্রশ্নের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আজ আমরা তাঁর কোন কথাগুলো শুনতে চাই না। কারণ একজন কবিকে জাতীয় প্রতীক বানানোর সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো তাঁকে নিরাপদ করে তোলা, তাঁর ধারালো অংশগুলো ছেঁটে ফেলে কেবল স্মরণীয় অংশটুকু রেখে দেওয়া। নজরুলের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বিশেষভাবে বিপজ্জনক, কারণ তাঁর গোটা জীবনটাই ছিল একধরনের নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান, তিনি কখনোই কোনো একক পরিচয়ে নিরাপদে স্থির থাকেন নাই।

১৯৭৬ সালের ২৯ অগাস্ট বিকেল সাড়ে পাঁচটায় নজরুলকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে, তাঁরই ইচ্ছা অনুযায়ী, নিজের লেখা এক গানের পঙক্তির প্রতিধ্বনিতে যেখানে তিনি মসজিদের পাশে সমাধিস্থ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন। এই সমাধিস্থলটি নিজেই একটি রূপক হয়ে দাঁড়ায়। মসজিদের পাশে শায়িত এক কবি, যাঁর সাহিত্য জীবনভর ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করেছে। তিনি এমন একজন কবি ছিলেন, যিনি একই সঙ্গে বহু পৃথিবীতে বাস করতেন, আর সম্ভবত সেই কারণেই আজও তাঁকে পুরোপুরি কোনো একটি রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ে বেঁধে ফেলা যায় না।


Picture of মরতুজা রশিদ

মরতুজা রশিদ

শেয়ার

আরও পড়েন

দুর্গের ভেতরে কয়েক হাজার সৈন্য, বাইরে প্রায় লক্ষাধিক উসমানীয় সেনা। এই লড়াই চলেছিল এক মাস, আর দুর্গ পতনের আগেই শেষ অভিযানে মৃত্যুবরণ করেন সুলতান সুলেমান।

দ্য পাবলিশ

উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁর সিনেমায় ফিরে যাওয়ার জন্য এই দশটি ছবি একটি ভালো শুরু।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

ছবিটি দেখে পাবলো পিকাসো বলেন “চার্চিল চাইলে পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারতেন, যদি না তাঁর সময় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকত”।

কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

যখন একটা গেমের পেছনে এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, তখন ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

Scroll to Top