হিগাশিনো অপরাধীকেও ক্ষমা করার জায়গা রাখতেন

গোয়েন্দা উপন্যাসের একটা পুরনো প্রতিশ্রুতি আছে। শেষ পৃষ্ঠায় সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

● কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

জুলাই ২৮, ২০২৬


গোয়েন্দা উপন্যাসের একটা পুরনো প্রতিশ্রুতি আছে। শেষ পৃষ্ঠায় সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে। কে খুন করল, কীভাবে করল, কবে করল। কেইগো হিগাশিনো এই প্রতিশ্রুতিটা ভাঙেননি ঠিকই, কিন্তু তার পাশে আরেকটা প্রশ্ন জুড়ে দিয়েছিলেন, যেটা অনেক বেশি অস্বস্তিকর, মানুষ কেন এই কাজ করতে পারল। প্রথম প্রশ্নের উত্তর একটা নাম দেয়। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দেয় একটা আয়না।

জাপানি রহস্য-সাহিত্যের ঐতিহ্য মূলত পাজল-কেন্দ্রিক। এডোগাওয়া রানপো থেকে শুরু হওয়া সেই ধারায় গল্প থাকে বটে, কিন্তু গল্পের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় কাঠামো— লক করা ঘর, নিখুঁত অ্যালিবাই, চতুর যুক্তির প্যাঁচ। পাঠক সেখানে অংশগ্রহণ করে দাবার খেলোয়াড়ের মতো, আবেগের জায়গা কম। হিগাশিনো এই ঐতিহ্যের ভেতর থেকেই বেরিয়ে এসেছিলেন, প্রকৌশলী হিসেবে প্রশিক্ষিত মস্তিষ্ক নিয়ে, যুক্তির কাঠামো তিনি ভালোই জানতেন। কিন্তু তার আসল অবদান কাঠামো ভাঙায় নয়, কাঠামোর ভেতরে মানবিক ভার ঢুকিয়ে দেওয়ায়।

“দ্য ডিভোশন অব সাসপেক্ট এক্স”-এ পাঠক প্রথম পাতাতেই জেনে যায় কে খুন করেছে। রহস্য তাই লুকানো থাকে না প্রশ্নে, লুকানো থাকে সিদ্ধান্ত। একজন মানুষ কতদূর যেতে পারে আরেকজনকে রক্ষা করার জন্য। এই স্থানান্তরটাই হিগাশিনোর স্বাক্ষর। তিনি “কে করল” থেকে সরে গিয়ে দাঁড় করান “কী মূল্য দিয়ে করল”-এর সামনে। অপরাধ এখানে ঘটনা নয়, পরিণতি।একটা দীর্ঘ, ধীর চাপের শেষ বিন্দু, যেখানে পৌঁছানোর আগে একজন মানুষ বহুবার নিজের সঙ্গে দর কষাকষি করেছে।

“জার্নি আন্ডার দ্য মিডনাইট সান”-এ এই ধারণাটা আরও বিস্তৃত হয়। এক দশকেরও বেশি সময় জুড়ে বিস্তৃত এই উপন্যাসে দুই চরিত্র কখনো একসঙ্গে দৃশ্যে হাজির হয় না, অথচ একজনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছায়া হয়ে অনুসরণ করে আরেকজনকে। এখানে অপরাধ একটা মুহূর্ত নয়, একটা জীবনযাপনের পদ্ধতি হয়ে ওঠে। হিগাশিনো এখানে যা করেন, তা প্রায় সামাজিক ইতিহাসের কাছাকাছি। জাপানের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের যুগে ব্যক্তিগত ক্ষতি কীভাবে নিঃশব্দে জমা হতে থাকে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

গালিলিও সিরিজে তিনি বিজ্ঞান আর অনুভূতির মধ্যে একটা অদ্ভুত সংলাপ তৈরি করেন। পদার্থবিদ ইউকাওয়া যুক্তি দিয়ে সমাধান খোঁজেন, কিন্তু প্রতিটি সমাধানের শেষে দাঁড়িয়ে থাকে এমন এক মানুষ, যার কষ্টের কোনো সমীকরণ নেই। বিজ্ঞান এখানে সত্যকে উন্মোচন করে, কিন্তু সেই সত্য সবসময় স্বস্তি দেয় না। এই দ্বন্দ্বটাই বোধহয় হিগাশিনোর পাঠকদের সবচেয়ে বেশি টানত। যুক্তির জগতে বাস করেও আমরা জানি, মানুষের ভেতরের গল্পটা যুক্তি দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না।

আর এখানেই তার বৈশ্বিক জনপ্রিয়তার একটা চাবিকাঠি রয়েছে। বিশেষত চীন, দক্ষিণ কোরিয়া আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়, যেখানে তিনি রীতিমতো ঘরোয়া নাম হয়ে উঠেছিলেন। দ্রুত নগরায়ণ, পারিবারিক কাঠামোর ভাঙন, প্রতিযোগিতার চাপ। এই অভিজ্ঞতাগুলো জাপানের বাইরেও এশিয়া জুড়ে একরকম পরিচিত। হিগাশিনোর চরিত্ররা প্রায়ই সাধারণ মানুষ, যারা অসাধারণ কোনো মন্দ ইচ্ছা থেকে নয়, বরং ভালোবাসা বা লজ্জা বা দায়বদ্ধতা থেকে ভয়ংকর কিছু করে ফেলে। এই নৈতিক অস্পষ্টতাই তাদের এত চেনা মনে হয়।

জাপানি সাহিত্যে ঘরানা-লেখাকে দীর্ঘদিন “নিম্ন সাহিত্য” হিসেবে দেখা হতো, “বিশুদ্ধ সাহিত্য”-এর থেকে আলাদা এক শ্রেণিতে। হিগাশিনোর ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা আর সমালোচকদের স্বীকৃতি একসঙ্গে অর্জন করার ক্ষমতা– নাওকি পুরস্কার থেকে শুরু করে অসংখ্য চলচ্চিত্র-নাট্যরূপ, এই দেয়ালটাকে অনেকখানি ক্ষয় করে দিয়েছে। প্রমাণ করেছে, জনপ্রিয়তা আর গভীরতা একে অন্যের বিরোধী নয়।

তিনি প্রায় একশো ছয়টি বই লিখে গেছেন, কিন্তু সংখ্যাটা আসল ব্যাপার নয়। আসল ব্যাপার হলো, প্রতিটি বইয়ে তিনি একই প্রশ্নটা নতুন করে জিজ্ঞেস করেছেন। একজন সাধারণ মানুষ কতটা অসাধারণ কষ্ট চেপে রাখতে পারে, তারপর কোন মুহূর্তে সেই চাপ ভেঙে পড়ে। রহস্য-সাহিত্যের চিরাচরিত সান্ত্বনা হলো, শেষ পাতায় বিশৃঙ্খলা আবার শৃঙ্খলায় ফিরে আসে। হিগাশিনো সেই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে দিতেন ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে রেখে যেতেন একটা অস্বস্তি, অপরাধী ধরা পড়ার পরও প্রশ্নটা থেকে যেত, তাহলে আমরা নিজেরা কতটা নিরাপদ এই মানবিক দুর্বলতা থেকে।

গত ২৩ জুলাই ২০১৬, কেইগো হিগাশিনো পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। যে মানুষটি কয়েক দশক ধরে পাঠকদের শিখিয়েছিলেন, সত্যের চেয়ে মানুষের ভেতরের অন্ধকার অনেক বেশি জটিল, তিনি নিজেই চলে গেলেন নীরবে। তার মৃত্যুর পর যা থেকে যাচ্ছে, তা কোনো শূন্যতা নয়, বরং একগুচ্ছ চরিত্র, যারা এখনো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি অপরাধের গল্প আসলে একটা প্রেমের বা ক্ষতির গল্প, ভিন্ন পোশাকে। রহস্য সমাধান হয়ে যায়। মানুষ বোঝা কখনো শেষ হয় না।


Picture of কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

শেয়ার

আরও পড়েন

দুর্গের ভেতরে কয়েক হাজার সৈন্য, বাইরে প্রায় লক্ষাধিক উসমানীয় সেনা। এই লড়াই চলেছিল এক মাস, আর দুর্গ পতনের আগেই শেষ অভিযানে মৃত্যুবরণ করেন সুলতান সুলেমান।

দ্য পাবলিশ

উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁর সিনেমায় ফিরে যাওয়ার জন্য এই দশটি ছবি একটি ভালো শুরু।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

ছবিটি দেখে পাবলো পিকাসো বলেন “চার্চিল চাইলে পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারতেন, যদি না তাঁর সময় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকত”।

কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

যখন একটা গেমের পেছনে এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, তখন ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

Scroll to Top