নিজের খোঁজে জালালুদ্দিন রুমি

কোনিয়ার মানুষ তখন দেখছিল এক আলেমকে। অন্যদিকে, ভাগ্য প্রস্তুত করছিল এক মহাকবিকে।

● মুজাহিদুল ইসলাম তানভীর

আগস্ট ৩, ২০২৬

নিজের খোঁজে জালালুদ্দিন রুমি The Publish

ইলাস্ট্রেশন : ক.জে / দ্য পাবলিশ


কিছু মানুষের প্রভাব তাঁদের নিজের যুগে আটকে থাকে না। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও তাঁদের চিন্তা মানুষের ভেতরে নাড়া দিতে থাকে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পারস্য কবি, ইসলামী আলেম, ফকিহ ও সুফি সাধক জালালুদ্দিন মুহাম্মদ রুমি এই বিরল তালিকার একজন। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত তাঁর কবিতা আজও লক্ষ পাঠকের কাছে প্রেম, আত্মোপলব্ধি আর আধ্যাত্মিকতার বার্তা পৌঁছে দেয়। কিন্তু রুমিকে শুধু ‘প্রেমের কবি’ হিসেবে দেখলে তাঁর আসল পরিচয়টা ফসকে যায়। তিনি ছিলেন কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক গভীর জ্ঞানের অধিকারী একজন আলেম। তাঁর কবিতা সেই জ্ঞানকেই মানুষের আত্মার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার একটা পথ ছিল মাত্র।

রুমির পুরো নাম জালালুদ্দিন মুহাম্মদ বালখী। ইতিহাসে তিনি ‘মাওলানা রুমি’ নামেও পরিচিত। ‘রুমি’ উপাধিটা এসেছে ‘রূম’ বা আনাতোলিয়া থেকে, যেখানে তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন। জন্ম অবশ্য হয়েছিল ১২০৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর, আজকের আফগানিস্তানের প্রাচীন নগরী বালখে। সে সময় বালখ ছিল খোরাসানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্র। ইসলামী সভ্যতা, পারস্য সাহিত্য, দর্শন আর ধর্মতত্ত্বে সমৃদ্ধ এক পরিবেশে কাটে তাঁর শৈশব। পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদ ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম সম্মানিত আলেম, খতিব ও আধ্যাত্মিক শিক্ষক। সমকালীন মানুষ তাঁকে ডাকত ‘সুলতানুল উলামা’—আলেমদের সুলতান। মা মু’মিনা খাতুনও এসেছিলেন সম্ভ্রান্ত ও ধর্মপরায়ণ পরিবার থেকে। রুমি তাই এমন একটি পরিবারে বড় হন, যেখানে জ্ঞানচর্চা আর নৈতিকতা ছিল রোজকার জীবনের অংশ।

শৈশবের একটি বড় ঘটনা ছিল পরিবারের দীর্ঘ ভ্রমণ। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে মধ্য এশিয়াজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর মঙ্গোল সাম্রাজ্যের বিস্তার জীবন লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছিল। চেঙ্গিস খানের বাহিনী একের পর এক নগর গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল তখন। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন এই অস্থিরতাই বাহাউদ্দিন ওয়ালাদকে পরিবারসহ বালখ ছাড়তে বাধ্য করেছিল, যদিও এ নিয়ে মতভেদ আছে। তবে বেশিরভাগ সূত্র একমত—এই যাত্রা রুমির জীবনের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দেয়।

বালখ থেকে যাত্রা শুরু করে তাঁরা নিশাপুর, বাগদাদ, মক্কা, দামেস্কসহ ইসলামী বিশ্বের একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ নগর পার হন। এই দীর্ঘ সফরে কিশোর রুমির সামনে খুলে যায় নানা সংস্কৃতি, জ্ঞানকেন্দ্র আর বিশিষ্ট আলেমদের জগৎ। নিশাপুরে বিখ্যাত সুফি কবি ফারিদউদ্দিন আত্তারের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জনশ্রুতি বলে, আত্তার কিশোর রুমির মধ্যে অসাধারণ প্রতিভার আভাস পেয়ে তাঁর পিতাকে বলেছিলেন—এই বালক একদিন পৃথিবীর অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে আগুন জ্বালাবে। ঘটনাটির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটি এখনও রুমির সম্ভাবনাময় শৈশবের প্রতীক হয়ে আছে। শেষপর্যন্ত পরিবার স্থায়ীভাবে থিতু হয় আনাতোলিয়ার কোনিয়ায়, যা তখন সেলজুক সালতানাতের অধীনে জ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার একটা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানেই রুমির ব্যক্তিত্ব পূর্ণতা পায়।

পিতার তত্ত্বাবধানে তিনি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন কুরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির, আরবি ভাষা, যুক্তিবিদ্যা ও পারস্য সাহিত্য। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন সৈয়দ বুরহানউদ্দিন মুহাক্কিক তিরমিজি। তাঁরই পরামর্শে রুমি দামেস্ক আর আলেপ্পোতে গিয়ে উচ্চশিক্ষা নেন, যেখানে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, দর্শন ও যুক্তিবিদ্যায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। ত্রিশ বছর বয়স হওয়ার আগেই তিনি কোনিয়ার অন্যতম শ্রদ্ধেয় আলেম ও শিক্ষক হয়ে ওঠেন। তাঁর দরসে ভিড় করত অসংখ্য শিক্ষার্থী। মানুষ ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর জানতে আসত, ফতোয়া নিত, নৈতিক দিকনির্দেশনা চাইত। তখনকার রুমি ছিলেন একজন সুপ্রতিষ্ঠিত, পরিমিত ও শাস্ত্রীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ পণ্ডিত।

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়টা তখনও আসেনি। এমন একজন মানুষ তাঁর জীবনে ঢুকতে চলেছিলেন, যিনি রুমির ভেতরের সুপ্ত কবি, প্রেমিক আর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানী সত্তাকে জাগিয়ে তুলবেন। সেই মানুষটির নাম শামস তাবরিজি। তাঁদের সাক্ষাৎ শুধু রুমির জীবন বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল বিশ্বসাহিত্য আর আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসও।

উত্থান

আজ রুমি নাম শুনলেই বেশিরভাগ মানুষের মনে ভেসে ওঠে প্রেম, কবিতা আর রহস্যময় আধ্যাত্মিকতার ছবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর নামে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য উদ্ধৃতি। কেউ তাঁকে বলেন প্রেমের কবি, কেউ সুফি দার্শনিক। এই পরিচয়গুলোর আড়ালে প্রায়ই হারিয়ে যায় একটা সত্য। শামস তাবরিজির সঙ্গে দেখা হওয়ার বহু আগেই জালালুদ্দিন রুমি ছিলেন তাঁর যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী আলেম, ফকিহ, মুফতি ও শিক্ষক। এই রুমিকে না জানলে পরবর্তী রুমিকে বোঝা কঠিন।

১২৩১ সালে পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাকেন্দ্রের দায়িত্ব এসে পড়ে তরুণ রুমির কাঁধে। বয়স তখন খুব বেশি নয়, তবু জ্ঞান আর চরিত্রের দৃঢ়তায় দ্রুত মানুষের আস্থা অর্জন করেন তিনি। কোনিয়া তখন সেলজুক সাম্রাজ্যের রাজধানী। রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন আর সাহিত্যের মিলনস্থল। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাত্র আসত কুরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ, যুক্তিবিদ্যা আর দর্শন শিখতে। অল্প সময়ের মধ্যে রুমির দরস হয়ে ওঠে সবচেয়ে জনপ্রিয়। ইতিহাসবিদদের বর্ণনায়, তাঁর প্রতিটি পাঠসভায় থাকত বিপুল ভিড়। আলেম, বিচারক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী। এমনকি সাধারণ মানুষও ধর্মীয় সমস্যার সমাধান জানতে আসত তাঁর কাছে।

রুমি দীর্ঘ সময় কাটাতে লাগলেন শামসের সঙ্গে একান্ত আলোচনায়।

রুমির জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সৈয়দ বুরহানউদ্দিন মুহাক্কিক তিরমিজির সঙ্গে সম্পর্ক। তিনি ছিলেন বাহাউদ্দিন ওয়ালাদের শিষ্য এবং রুমির আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। তিরমিজি বুঝেছিলেন, রুমির মেধা অসাধারণ, কিন্তু সেই মেধাকে আরও গভীর সাধনা আর আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে পরিপূর্ণ করা দরকার। তাঁর পরামর্শে রুমি দামেস্ক-আলেপ্পোতে দীর্ঘ সময় কাটান, যেখানে শুধু ধর্মীয় জ্ঞান নয়, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, ভাষাতত্ত্ব আর সমকালীন বৌদ্ধিক বিতর্কেও নিজেকে দক্ষ করে তোলেন। এই সময়ের রুমি মূলত একজন গবেষক ও শিক্ষক ছিলেন, কবি নন।

তাহলে কি তিনি তখন কবিতা লিখতেন? অনেকে মনে করেন রুমি শামসের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে থেকেই বিখ্যাত কবি ছিলেন। ঐতিহাসিক তথ্য সে ধারণাকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। শামসের আগেও তিনি ফারসিতে কিছু কবিতা আর ধর্মীয় বক্তব্য লিখেছিলেন, কিন্তু তখন তাঁর পরিচয় কবির চেয়ে অনেক বেশি ছিল একজন আলেমের। তাঁর প্রথমদিকের খুতবা-ওয়াজ পরে সংকলিত হয় মাজালিস-ই সাবআ নামে। এই গ্রন্থে দেখা যায়, তাঁর আলোচনার মূল বিষয় ছিল কুরআনের তাফসির, নৈতিকতা, তাকওয়া, আত্মসংযম আর আল্লাহর প্রতি আনুগত্য। প্রেম এখানেও আছে, তবে তা মূলত আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার ভাষায়। সৌন্দর্যও আছে, তবে তা মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার আহ্বান হিসেবে।

তাঁর খ্যাতির ভিত্তি কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। তিনটি গুণ তাঁকে সমকালীন সমাজে অসাধারণ মর্যাদা এনে দেয়। প্রথমত, অসামান্য জ্ঞান। কুরআন, হাদিস, ফিকহ, তাফসির, আরবি ও পারস্য সাহিত্যে তার গভীর দখল। দ্বিতীয়ত, চরিত্র। সমকালীন সূত্র তাঁকে বর্ণনা করেছে বিনয়ী, দানশীল, ধৈর্যশীল আর সহজপ্রাপ্য মানুষ হিসেবে। ক্ষমতাবানদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও জ্ঞানকে তিনি কখনও ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার বানাননি। তৃতীয়ত, শিক্ষাদানের পদ্ধতি। কঠিন বিষয়কে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা তাঁর ছিল, ফলে সাধারণ মানুষ যেমন তাঁকে বুঝত, পণ্ডিতরাও তাঁর আলোচনায় খুঁজে পেতেন বৌদ্ধিক গভীরতা।

আজকের মতো তখনও রুমি জনপ্রিয় ছিলেন, তবে জনপ্রিয়তার ধরনটা ছিল একেবারে আলাদা। আজ মানুষ তাঁকে চেনে মূলত কবি হিসেবে। কিন্তু ত্রয়োদশ শতাব্দীর কোনিয়ায় তাঁর পরিচয় ছিল শরিয়তবিশারদ, বিচারক, শিক্ষক আর ধর্মীয় নেতা হিসেবে। রাজদরবারে তাঁর সম্মান ছিল, ব্যবসায়ীরা পরামর্শ চাইতেন, বিচারকরা তাঁর মত গ্রহণ করতেন, দূরদূরান্ত থেকে ছাত্ররা তাঁর দরসে আসত। সংক্ষেপে বলা যায়, শামস তাবরিজির আসার আগেই রুমি এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন, যেখানে নতুন কিছু অর্জনের দরকার আছে বলে অনেকেই মনে করতেন না। কিন্তু ইতিহাস প্রায়ই সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের সূচনা করে ঠিক তখনই, যখন সবকিছু স্থির মনে হয়।

কোনিয়ার মানুষ তখন দেখছিল একজন সম্মানিত আলেমকে। অন্যদিকে, ভাগ্য প্রস্তুত করছিল একজন মহাকবিকে। একজন রহস্যময় দরবেশ বহু পথ পেরিয়ে, এগিয়ে আসছিলেন কোনিয়ার দিকে । শরীরে সাধারণ পোশাক, ভাষা তীক্ষ্ণ। তাঁর লক্ষ্য একজন মানুষ, জালালুদ্দিন মুহাম্মদ রুমি।

যে সাক্ষাৎ বদলে দিয়েছিল ইতিহাস

ইতিহাসে এমন কিছু সাক্ষাৎ আছে যা দুই ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটা সভ্যতার চিন্তাজগৎকেই নতুন দিক দেখায়। সক্রেটিস-প্লেটো, আরিস্টটল-আলেকজান্ডার, কিংবা আল-গাজ্জালির আধ্যাত্মিক সংকট। এসবের পাশে রুমি ও শামস তাবরিজির সাক্ষাৎও বিশ্ব-ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। তাই এখানে ইতিহাস আর লোককথাকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

শামসউদ্দিন মুহাম্মদ তাবরিজি ছিলেন পারস্যের তাবরিজ নগরীর এক ভবঘুরে দরবেশ, সুফি সাধক ও অসাধারণ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুবই কম। কোনো রাজদরবারের আলেম ছিলেন না তিনি, বড় কোনো খানকাহর প্রধানও নয়। বরং নিজেকে আড়ালে রাখতেই পছন্দ করতেন। সমকালীনরা তাঁকে ডাকতেন ‘পরিন্দা’, উড়ন্ত পাখি। কারণ তিনি কোথাও দীর্ঘদিন থাকতেন না, এক শহর থেকে অন্য শহরে ঘুরে বেড়াতেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন, আবার অদৃশ্য হয়ে যেতেন। শামস বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত জ্ঞান শুধু বই পড়ে আসে না, তা আত্মার গভীর অভিজ্ঞতা থেকে আসে। তিনি খুঁজছিলেন এমন একজন শিষ্য, যার মধ্যে এই উপলব্ধির সম্ভাবনা দেখা যায়।

সাল ১২৪৪। কোনিয়া তখন জ্ঞানচর্চার উজ্জ্বল কেন্দ্র। রুমি সেখানে প্রতিষ্ঠিত আলেম, শিক্ষক ও সমাজনেতা, চারপাশে ছাত্র আর অনুসারীর ভিড়। ঠিক তখনই শহরে এসে পৌঁছান এক অপরিচিত দরবেশ। ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত সাক্ষাৎগুলোর একটা ঘটতে চলেছে তখন। রুমি ও শামসের প্রথম সাক্ষাৎ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা প্রচলিত আছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পে, রুমি ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছিলেন, সঙ্গে বইভর্তি বোঝা। শামস এসে জিজ্ঞেস করলেন, এই বইগুলো কী। রুমি বললেন, এমন জ্ঞান যা তুমি বুঝবে না। কথিত আছে, শামস তখন বইগুলো পানিতে ফেলে দেন, আর পরে সেগুলো শুকনো অবস্থায় ফিরে এলে রুমি বিস্মিত হন। তখন শামস জবাব দেন, এমন অভিজ্ঞতা যা আপনিও এখনও জানেন না। গল্পটা খুবই জনপ্রিয়, কিন্তু বেশিরভাগ আধুনিক ইতিহাসবিদ একে প্রতীকী বা পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা লোককথা বলেই মনে করেন। এর জোরালো ঐতিহাসিক প্রমাণ নাই। আরেকটা তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য বর্ণনা বলে, শামস রুমিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন হযরত মুহাম্মদ (সা.) আর বায়েজিদ বুস্তামীর আধ্যাত্মিক উক্তির মধ্যে পার্থক্য কোথায়। এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে শামস রুমিকে বৌদ্ধিক বিতর্কে নয়, আত্মিক উপলব্ধির স্তরে ভাবতে বাধ্য করেছিলেন। ঠিক কী প্রশ্ন ছিল তা নিয়ে মতভেদ থাকলেও গবেষকদের একটা বড় অংশ একমত যে, তাঁদের প্রথম আলাপ ছিল গভীর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আলোচনাকেন্দ্রিক।

এই সাক্ষাতের পর যা ঘটল, কোনিয়ার মানুষ তা কল্পনাও করতে পারেনি। রুমি ধীরে ধীরে নিয়মিত পাঠদান কমিয়ে দিলেন।

কুরআন, হাদিস, তাসাউফ, আত্মপরিচয় আর আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন দুজন। শামস তাঁকে নতুন কোনো ধর্ম শেখাননি, নতুন শরিয়তও দেননি। বরং রুমির ভেতরে সুপ্ত থাকা অনুভূতির জগৎটাকে যেন জাগিয়ে তুলেছিলেন। এভাবে বহু বছরের অর্জিত জ্ঞান নতুন আলোয় অর্থ পেতে শুরু করে। রুমি পরে ইঙ্গিত করেছিলেন, শামস তাঁকে বইয়ের অক্ষর থেকে জীবন্ত অভিজ্ঞতার দিকে নিয়ে গিয়েছিলেন।

রুমির এই বদল তাঁর পরিবার, ছাত্র আর অনুসারীদের অনেকের কাছেই মেনে নেওয়া সহজ ছিল না। যে শিক্ষক প্রতিদিন শত শত ছাত্রকে দরস দিতেন, তিনি এখন বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছেন এক অপরিচিত দরবেশের সঙ্গে। কে এই শামস, কেন তাঁর ওপর এত প্রভাব। অনেকের মনে সন্দেহ জন্মায়। ঈর্ষা, ভুল বোঝাবুঝি আর সামাজিক অস্বস্তি ধীরে ধীরে শামসকে ঘিরে একটা বিরূপ পরিবেশ তৈরি করে। কিছু সূত্র বলে, রুমির কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ছাত্রও এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি। তবে একটা বিষয়ে সতর্ক থাকা নন দরকার। পরবর্তী যুগের কিছু কাহিনিতে এই ঘটনাগুলোকে বেশ নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ইতিহাসবিদরা মনে করেন শামসের প্রতি বিরোধ ছিলনা যে তা না, কিন্তু তার বাস্তবতা নিয়ে অতিরঞ্জনও হয়েছে।

শামস আর রুমির সম্পর্ককে আধুনিক অর্থে ব্যাখ্যা করতে গেলে ভুল হবে। এটা ছিল একজন প্রতিষ্ঠিত আলেম আর একজন মুক্তচিন্তার আধ্যাত্মিক সাধকের গভীর সংলাপ। শামস প্রশ্ন করতেন, রুমি উত্তর খুঁজতেন। আবার কখনও উল্টো হতো। রুমি প্রশ্ন করতেন, শামস নীরব থাকতেন। এই নীরবতাও ছিল শিক্ষার অংশ। শামস রুমিকে শিখিয়েছিলেন, জ্ঞান তখনই পূর্ণতা পায় যখন তা মানুষের অন্তরকে পাল্টে দেয়। আর রুমি বুঝতে পারলেন, আল্লাহকে জানার পথ কেবল যুক্তির নয়। ভালোবাসা, বিনয় আর আত্মসমর্পণেরও।

যে রুমি এতদিন মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতেন, তিনি এবার মুখোমুখি হলেন নিজের হৃদয়ের প্রশ্নগুলোর। যে আলেম এতদিন অন্যদের পথ দেখিয়েছেন, তিনি এবার নিজেই যাত্রা শুরু করলেন অন্তরের আরও গভীর পথে। কিন্তু এই যাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। কোনিয়ায় শামসকে ঘিরে বিরোধ ক্রমেই তীব্র হচ্ছিল, আর একদিন হঠাৎ তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তাঁর এই অন্তর্ধান শুধু একজন বন্ধুর বিচ্ছেদ ছিল না। রুমির জীবনে এমন এক শূন্যতা তৈরি করল, যার বেদনা থেকে জন্ম নেয় বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যধারা।

এক অমর কবির জন্ম

কিছু বিচ্ছেদ শুধু একজন প্রিয়জনকে কেড়ে নেয় না, একটা নতুন মানুষকে জন্ম দেয়। রুমির জীবনে শামস তাবরিজির অন্তর্ধান ছিল ঠিক তেমনই একটা ঘটনা। এই বিচ্ছেদের আগুনে পুড়ে তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং সেই আগুন থেকেই জন্ম নিয়েছিল এমন এক কাব্যভাষা, যা আট শতাব্দী পর আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষকে আলোড়িত করে।

অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, ১২৪৭ সালের দিকে শামস হঠাৎ কোনিয়া থেকে অদৃশ্য হয়ে যান। এরপর কী হয়েছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক তথ্য প্রায় নেই বললেই চলে। অন্তত তিনটি প্রধান মত পাওয়া যায় এ নিয়ে। প্রথম মত বলে, রুমির কয়েকজন অনুসারী আর শামসবিরোধী ব্যক্তির ষড়যন্ত্রে তিনি নিহত হন। এই বর্ণনা বেশ জনপ্রিয়, যদিও এর পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। দ্বিতীয় মত অনুযায়ী, বিরূপ পরিবেশে অতিষ্ঠ হয়ে শামস নিজেই কোনিয়া ছাড়েন এবং আর ফেরেননি। আধুনিক গবেষকদের একটা বড় অংশ এই ব্যাখ্যাকেই তুলনামূলক বেশি সম্ভাব্য মনে করেন। তৃতীয় মত অনুসারে, তিনি নিভৃতে জীবন কাটাতে অন্যত্র চলে যান আর সেখানেই মারা যান। সত্য যাই হোক, রুমির কাছে বিষয়টা ছিল একটাই। যাঁর উপস্থিতি তাঁর অন্তরকে জাগিয়ে তুলেছিল, তিনি আর পাশে নেই।

শামসের অনুপস্থিতি রুমিকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। বিভিন্ন সূত্র বলে, তিনি তাঁর খোঁজে দূত পাঠিয়েছিলেন, এমনকি শামস দামেস্কে আছেন এমন সংবাদ পেয়ে ফিরিয়ে আনারও চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবার তাঁকে ফিরে আসতে হয়েছিল শূন্য হাতে। এই শূন্যতাই ধীরে ধীরে তাঁর ভেতরে নতুন এক উপলব্ধির জন্ম দেয়। তিনি বুঝতে শুরু করেন, যে আলো তিনি শামসের মধ্যে দেখেছিলেন, তা কেবল একজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই আলো আল্লাহর দান, যা মানুষের হৃদয়কে আলোকিত করে। এই উপলব্ধিই তাঁর আধ্যাত্মিক যাত্রাকে নিয়ে যায় নতুন উচ্চতায়।

শামসের বিচ্ছেদের পর রুমির ভাষা বদলে যায়। যিনি এতদিন ধর্মীয় বক্তৃতা আর ফতোয়ার ভাষায় কথা বলতেন, তিনি এখন কথা বলতে শুরু করলেন কবিতার ভাষায়। তাঁর কবিতা নিছক অলংকারের খেলা ছিল না। প্রতিটি পঙ্‌ক্তি ছিল একটি খোঁজ, প্রতিটি উপমা আত্মজিজ্ঞাসা, প্রতিটি রূপকে ছিল স্রষ্টার দিকে ফিরে যাওয়ার আকুতি। তিনি লিখেছিলেন, বিচ্ছেদের বাঁশি যে সুর তোলে তা তার জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আর্তনাদ। এই বাঁশির রূপক পরে তাঁর সমগ্র দর্শনের প্রতীক হয়ে ওঠে। মানুষের আত্মাও যেন তার প্রকৃত উৎস, আল্লাহর সান্নিধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই তার অন্তরে কাজ করে এক অদম্য প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

রুমির কবিতার প্রথম বড় সংকলন দিওয়ান-ই শামস-ই তাবরিজি। বিস্ময়ের বিষয়, এই বিশাল কাব্যসংকলনের নাম তিনি নিজের নামে রাখেননি, রেখেছিলেন প্রিয় বন্ধু ও আধ্যাত্মিক সহযাত্রী শামস তাবরিজির নামে। এতে সংকলিত হয়েছে হাজার হাজার গজল, রুবাই আর গীতিকবিতা। এগুলোকে শুধু বিচ্ছেদের কবিতা ভাবলে ভুল হবে। এখানে শামস কখনও একজন ব্যক্তি, কখনও সত্য, আলো, জাগরণ বা আল্লাহর দিকে পরিচালিত এক আধ্যাত্মিক প্রতীক। এই কারণেই গবেষকরা মনে করিয়ে দেন, রুমির কবিতায় ‘প্রেম’ শব্দটাকে শুধু পার্থিব অর্থে পড়লে তাঁর রচনার গভীরতা ধরা পড়ে না।

শামসের বিচ্ছেদের পর রুমির আধ্যাত্মিক চর্চার একটা গুরুত্বপূর্ণ রূপ ছিল সেমা। সুফি ঐতিহ্যের একটা বিখ্যাত বর্ণনা বলে, একদিন কোনিয়ার বাজারে ধাতুর হাতুড়ির ছন্দময় শব্দ শুনে তিনি গভীর ভাবাবেশে ঘুরতে শুরু করেন। এর সব খুঁটিনাটি ইতিহাস দিয়ে যাচাই করা যায় না, তবে এটুকু নিশ্চিত যে রুমির অনুসারীদের মধ্যে সঙ্গীত, কিরাত, জিকির আর নিয়ন্ত্রিত ঘূর্ণনের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করার একটা আধ্যাত্মিক অনুশীলন গড়ে ওঠে। পরে এটাই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায় ‘মাওলাভি তরিকা’ বা ‘ঘূর্ণায়মান দরবেশ’ নামে। তবে মনে রাখা দরকার, রুমির কাছে এই ঘূর্ণন কোনো প্রদর্শনী ছিল না। এটা ছিল আত্মকে কেন্দ্র থেকে সরিয়ে স্রষ্টাকে কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠা করার একটা প্রতীকী অনুশীলন।

শামসের পর রুমির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা নাম হুসামউদ্দিন চলাবি, তাঁর ঘনিষ্ঠ শিষ্য ও সহযোগী। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, একদিন হুসামউদ্দিন রুমিকে বলেন, মানুষের আত্মশুদ্ধির জন্য এমন একটা গ্রন্থ দরকার যা সহজ ভাষায় গভীর আধ্যাত্মিক সত্য তুলে ধরবে। এই অনুরোধই রুমিকে তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি রচনায় উদ্বুদ্ধ করে। এভাবেই শুরু হয় মসনবীর যাত্রা। ছয় খণ্ডে বিস্তৃত এই মহাকাব্য শুধু কবিতার সংকলন নয়; কুরআনের আয়াত, হাদিস, উপমা, নৈতিক শিক্ষা, গল্প, দর্শন আর মানুষের অন্তর্জগতের এক বিস্ময়কর সমন্বয়। মসনবীর সূচনা হয় সেই বিখ্যাত ‘নে’ বা বাঁশির আর্তনাদ দিয়ে। অনেক গবেষকের মতে এই সূচনাই রুমির সমগ্র দর্শনের সারাংশ। মানুষের আত্মা তার উৎসের দিকে ফিরে যেতে চায়।

শামসের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে রুমি ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত আলেম। শামসের অন্তর্ধানের পর তিনি সেই পরিচয় হারাননি, বরং তার সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন একটা পরিচয়। মহাকবি। তাঁর কবিতা শরিয়তের বিকল্প ছিল না। তাঁর কাছে কবিতা ছিল এমন একটা ভাষা, যা যুক্তির সীমা পেরিয়ে হৃদয়ের কাছে পৌঁছাতে পারে। এই কারণেই তাঁর রচনায় কুরআনের আয়াত, নবীদের কাহিনি, নৈতিক শিক্ষা আর প্রেম মিশে গেছে একই স্রোতে। শামসের বিচ্ছেদ রুমিকে ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু সেই ভাঙনের ভেতর থেকেই তিনি খুঁজে পান নিজের প্রকৃত কণ্ঠস্বর। যে মানুষটা একদিন ছাত্রদের সামনে দাঁড়িয়ে ফিকহ পড়াতেন, তিনিই এখন গল্প, উপমা আর কবিতার মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়কে শেখাচ্ছেন। আর সেই শিক্ষার কেন্দ্রে ছিল একটাই আহ্বান। নিজেকে জানো, স্রষ্টার দিকে ফিরে চলো। কারণ সমস্ত বিচ্ছেদের শেষ ঠিকানা একটাই তাঁর সান্নিধ্য।


Picture of মুজাহিদুল ইসলাম তানভীর

মুজাহিদুল ইসলাম তানভীর

শেয়ার

আরও পড়েন

দুর্গের ভেতরে কয়েক হাজার সৈন্য, বাইরে প্রায় লক্ষাধিক উসমানীয় সেনা। এই লড়াই চলেছিল এক মাস, আর দুর্গ পতনের আগেই শেষ অভিযানে মৃত্যুবরণ করেন সুলতান সুলেমান।

দ্য পাবলিশ

উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁর সিনেমায় ফিরে যাওয়ার জন্য এই দশটি ছবি একটি ভালো শুরু।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

ছবিটি দেখে পাবলো পিকাসো বলেন “চার্চিল চাইলে পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারতেন, যদি না তাঁর সময় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকত”।

কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

যখন একটা গেমের পেছনে এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, তখন ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

Scroll to Top