এলভিস প্রিসলিকে শুধু গায়ক বলা যায় না। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল যেন একটা বিদ্যুৎ ঝলক। কখনো হৃদয়ের গভীর ব্যথা, কখনো পুরো প্রজন্মের বিদ্রোহের আগুন হয়ে ওঠা এক কন্ঠস্বর। ১৯৩৫ সালের ৮ জানুয়ারি মিসিসিপির ছোট্ট শহর টুপেলোতে জন্ম নেওয়া এলভিস অ্যারন প্রিসলি পরে হয়ে উঠলেন ‘দ্য কিং অফ রক অ্যান্ড রোল’। বাবা ভার্নন প্রিসলি আর মা গ্ল্যাডিস লাভের দুই রুমের সেই সাদামাটা ঘরে জন্ম। তাঁর যমজ ভাই জেসি গ্যারন জন্মের ঠিক ৩৫ মিনিট আগে মারা যান। সেই ক্ষতি এলভিসকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়িয়েছে। পরিবার ছিল অত্যন্ত গরিব। বাবা ভার্নন অদ্ভুত সব কাজ করে চলতেন, একবার চেক জালিয়াতির অভিযোগে জেলও খেটেছিলেন। পরিবার প্রায়ই প্রতিবেশীদের সাহায্য আর সরকারি খাবারের ওপর নির্ভর করত।
ছোটবেলা থেকেই গান ছিল এলভিসের রক্তে। অ্যাসেম্বলি অফ গড চার্চে গসপেল গাইতেন, মায়ের কোলে বসে গান শুনতেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে মিসিসিপি-আলাবামা ফেয়ারে প্রথম পাবলিক পারফরম্যান্সে ‘ওল্ড শেপ’ গেয়ে পঞ্চম স্থান লাভ করেন। জন্মদিনে প্রথম গিটার পান মায়ের কাছ থেকে, কিন্তু কোনো ফর্মাল ট্রেনিং নেই। সবই শিখতেন কানে শুনে। ১৯৪৮ সালে পরিবার মেমফিসে চলে আসে। হিউমস হাই স্কুলে পড়াতেন। ছিলেন লাজুক প্রকৃতির মানুষ, কিন্তু বিয়েল স্ট্রিটের ব্লুজ আর আরএন্ডবি শুনে মুগ্ধ হতেন ঠিকই। হ্যাঙ্ক স্নো, রয় অ্যাকুফ, আর্নেস্ট টাব্বের কান্ট্রি আর আর্থার ক্রুডাপের ব্লুজ, সব মিশিয়ে তিনি নিজের স্টাইল তৈরি করছিলেন। স্কুলের ট্যালেন্ট শো-তে ‘টিল আই ওয়াল্টজ অ্যাগেইন উইথ ইউ’ গেয়ে হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে যান এলভিস।
১৯৫৩ সালে স্কুল শেষ করে পেটের টানে ট্রাক চালাতে শুরু করলেন, কিন্তু স্বপ্ন ছিল গানের। তাই সেই বছরই সান রেকর্ডসে গিয়ে মায়ের জন্য ‘মাই হ্যাপিনেস’ রেকর্ড করেন। প্রডিউসার স্যাম ফিলিপস শুনে বলেছিলেন, “এই সাদা ছেলেটা কালোদের সুর বয়ে আনবে।” ১৯৫৪ সালের জুলাইয়ে ‘দ্যাটস অল রাইট’ এই গানটা আগুন ধরিয়ে দিল। স্কটি মুর (গিটারিস্ট ) আর বিল ব্ল্যাক (বেসিস্ট)-এর সঙ্গে তিনি রকাবিলি জন্ম দিলেন। দেওয়ি ফিলিপসের রেডিও শো-তে বাজতেই পুরো মেমফিস পাগল।

১৯৫৫ সালে কলোনেল টম পার্কারের সঙ্গে দেখা এলভিসের। তিনি এলভিসের ম্যানেজার হলেন। ১৯৫৬ সালের জানুয়ারিতে ‘হার্টব্রেক হোটেল’ প্রথম নাম্বার ওয়ান হিট আনে এলভিসের জীবনে। তারপর আর থামেনি। এড সুলিভান শো-তে ৬ কোটি দর্শক দেখলেন তাঁকে। মিলটন বার্লে শো-তে হিপ শেকিং নিয়ে বিতর্কিত হোন। এফবিআই পর্যন্ত চিঠি লিখল। টিভিতে কোমরের নিচ থেকে শুধু দেখানো হতো। কিন্তু তাতে কী? তিনি রক অ্যান্ড রোলকে মূলধারায় নিয়ে এলেন। ‘হাউন্ড ডগ’, ‘জেলহাউস রক’, ‘লাভ মি টেন্ডার’ সব হিট। ১৯৫৬ সালে প্রথম সিনেমা ‘লাভ মি টেন্ডার’। মোট ৩১টা ছবি করেছেন এলভিস। প্রথমদিকে সাফল্য, কিন্তু পরে সমালোচকরা বলতেন ফর্মুলা: গান, নাচ, রোমান্স। তবু বক্স অফিসে চলত। ১৯৫৭ সালে গ্রেসল্যান্ড কিনলেন। সেই প্রাসাদ যেখানে তিনি রাজা হয়ে থাকতেন। সাল ১৯৫৮ আর্মিতে ডাক পড়ল। মিডিয়া ইভেন্ট। জার্মানিতে পোস্টিং। সেখানেই মা গ্ল্যাডিসের মৃত্যু, হেপাটাইটিস আর হার্ট ফেলিয়োরে। এলভিস ভেঙে পড়লেন। একই সময়ে ১৪ বছরের প্রিসিলা বিয়ুলিউ-এর সঙ্গে দেখা। সে ছিল এয়ার ফোর্স অফিসারের মেয়ে। এলভিস বলতেন, “সে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।” ১৯৬০ সালে আর্মি থেকে ফিরে আবার গান ধরেন। ষাটের দশকে ব্যস্ত হয়ে পড়েন সিনেমায়। ‘জি আই ব্লুজ’, ‘ব্লু হাওয়াই’, ‘ভিভা লাস ভেগাস’।
১৯৬৭ সালে প্রিসিলার সঙ্গে বিয়ে হলো লাস ভেগাসে। এক বছর পর জন্ম হয় মেয়ে লিসা মারি। কিন্তু বিয়ে টেকেনি। ১৯৭২ সালে আলাদা হয়ে, ৭৩ সালে ডিভোর্স। প্রিসিলা পরে বলেন, এলভিসের জীবনযাপন, ড্রাগের নেশা, অন্য মহিলাদের প্রতি আকর্ষণ সব ছিল কঠিন। তবু তিনি গ্রেসল্যান্ডে একা থাকতেন, ম্যানেজার পার্কারের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠছিল। ১৯৬৮ সালের এনবিসি টিভি স্পেশাল ‘কামব্যাক স্পেশাল’ -এ কালো চামড়ার স্যুট, লেদার জ্যাকেট পড়ে হাজির এলভিস। এ যেন নতুন এলভিস। ‘ইফ আই ক্যান ড্রিম’ হিট হলো। তারপর লাস ভেগাসের ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে রেসিডেন্সি। প্রতি রাতে হাজার হাজার ফ্যান। ১৯৬৯ থেকে শুরু, বছরে মিলিয়ন ডলার। শুরু হলো নতুন ব্যান্ড, জেমস বার্টন গিটারে। কারাতে মুভমেন্ট, জাম্পস্যুট। সেই আইকনিক লুক। ১৯৭৩ সালের ‘আলোহা ফ্রম হাওয়াই’ প্রথম সোলো আর্টিস্টের গ্লোবাল টেলিকাস্ট। লক্ষ লক্ষ দর্শক। ‘সাসপিশাস মাইন্ডস’ এর মাধ্যমে সাত বছর পর প্রথম পপ নাম্বার ওয়ান। মোট ৭০০-এর বেশি গান রেকর্ড করেন এলভিস, ১৪৯টা বিলবোর্ড হট ১০০-এ। আরসিএআইএ সার্টিফায়েড ১৪৬.৫ মিলিয়ন অ্যালবাম শুধু আমেরিকায়। তিনটে গ্র্যামি, সব গসপেলের জন্য।
কিন্তু সবশেষে শরীর ভাঙছিল এলভিসের। প্রেসক্রিপশন ড্রাগের নেশা, পেইনকিলার, সেডেটিভ, ওপিয়েটস। ওজন বেড়ে ২৫ স্টোন। হার্ট, লিভার, কিডনি সব কিছুতেই সমস্যা ধরা পড়ে। ডায়াবেটিস, গ্লুকোমা, ক্রনিক কনস্টিপেশন। ১৯৭৭ সাল। ট্যুর চলছিল। ১৬ অগাস্ট সকালে গ্রেসল্যান্ডে। সারা রাত ট্যুরের পরিকল্পনা। সকাল ৭টায় বিছানায় যান। আর বিকেল ২:৩০-এ গার্লফ্রেন্ড জিঞ্জার অ্যালডেন তাঁকে বাথরুমের মেঝেতে অচেতন অবস্থায় পান। পাজামা গোড়ালিতে, শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল, কিন্তু ৪২ বছর বয়সেই শেষ হলো এলভিস প্রিসলির জীবনযাত্রা। অফিসিয়াল কারণ কার্ডিয়াক অ্যারিদমিয়া। কিন্তু টক্সিকোলজি রিপোর্টে উঠে এল ডিলাউডিড, পারকোডান, ডেমেরল, কোডেইন, কোয়ালুডের অতিরিক্ত মাত্রা। অটোপসিতে ধরা পড়ল হাইপারটেনসিভ হার্ট ডিজিজ, করোনারি আর্টারি ডিজিজ। ডাক্তাররা বললেন, কনস্টিপেশনের কারণে স্ট্রেইনিং (ভালসালভা ম্যানুভার) হার্টে চাপ দিয়েছে। সারা বিশ্ব শোকে মুহ্যমান। লক্ষ লক্ষ মানুষ গ্রেসল্যান্ডে ভিড় করলেন। শেষকৃত্যে জড়ো হলো বিশাল জনসমাগম।
বিশ্ববিখ্যাত গায়ক জন লেনন একবার বলেছিলেন, “এলভিসের আগে কিছুই ছিল না।” ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রা প্রথমে তাঁর স্টাইল নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন, কিন্তু মৃত্যুর পর বলেন, “তিনি ছিলেন একজন বিবেচক বন্ধু।” মুহাম্মদ আলি বলেছিলেন, “এলভিস প্রিসলি ছিলেন সবচেয়ে মিষ্টি, নম্র এবং সুন্দর মানুষ যাকে আপনি চিনতে পারেন।” হলিউড অভিনেতা ডোয়েন ‘দ্য রক’ জনসন বলেন “মহিলারা তাঁকে চাইতেন, আর পুরুষরা তাঁর মতো হতে চাইতেন।” পল ম্যাককার্টনি তো তাঁকে ‘কিং’ বলেই মেনেছিলেন। বিটলস থেকে রোলিং স্টোনস। সবাই স্বীকার করেছেন, এলভিসই রক অ্যান্ড রোলের দরজা খুলে দিয়েছিলেন।
যখন সেগ্রিগেশনের যুগ চলছিল, তখন তিনি কালো আর সাদা সংগীতের মিলন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর জীবন ছিল রক অ্যান্ড রোলের মতোই দ্রুত, উন্মাদ, বেদনাময়। গরিব ঘর থেকে বিশ্বজয়ী। শুধু গান গাননি, একটা যুগের সংস্কৃতি বদলে দিয়েছিলেন এলভিস প্রিসলি।