লিভারপুলের মেনলাভ অ্যাভিনিউয়ের একটি সাদামাটা ইটের বাড়ি। নাম, মেনডিপস। সেখানে এক বালক প্রতি রাতে ঘুমাতে যেত মা ছাড়া, বাবা ছাড়া, খালা মিমির কড়া শাসন আর এক ধরনের অনুচ্চারিত শূন্যতা সঙ্গে নিয়ে। সেই বালক বড় হয়ে এমন একটা গান লিখবে, যেটা পরবর্তী ষাট বছর ধরে পৃথিবীর প্রতিটি যুদ্ধবিরতির মঞ্চে, প্রতিটি মোমবাতি-প্রতিবাদে, প্রতিটি নিউ ইয়ার নাইটে গাওয়া হবে। এটা ভাবলে ইতিহাসের একটা পাষাণ রসিকতার কথা মনে পড়ে। কারণ যে মানুষটা “ইমাজিন” লিখেছিলেন, যিনি বলেছিলেন একদিন পৃথিবীতে কোনো সীমান্ত থাকবে না, থাকবে না কোনো ধর্ম, কোনো যুদ্ধ। অথচ, তিনি নিজে কখনো নিজের ভেতরের যুদ্ধটা থামাতে পারেননি।
বলছি,জন উইনস্টন লেননের কথা। জন্ম ১৯৪০ সালের ৯ অক্টোবর, লিভারপুলে। তাঁর মা জুলিয়া আর বাবা আলফ্রেড লেনন। আলফ্রেড ছিলেন একজন মার্চেন্ট সিম্যান, আইরিশ বংশোদ্ভূত, আর ছেলের নাম রেখেছিলেন নিজের বাবার নামে, সঙ্গে যোগ করেছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর নামও।
কিন্তু নাম রাখা পর্যন্তই ছিল আলফ্রেডের ভূমিকা। সমুদ্রে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানো এই মানুষটা শিগগিরই পরিবার থেকে হারিয়ে গেলেন। আর জুলিয়া ছিলেন মুক্তমনা, গানপাগল, কিন্তু সংসারের জন্য প্রস্তুত নন এমন এক নারী। তাই ছেলেকে তুলে দিলেন নিজের বোন মিমির হাতে। পাঁচ বছর বয়সে বাবা-মা দুজনের কাছ থেকেই বিচ্ছিন্ন হওয়ার এই অভিজ্ঞতা লেননকে সারাজীবন তাড়া করেছে।
মনোবিজ্ঞানীরা যাকে বলেন “অ্যাটাচমেন্ট ট্রমা”, আর ফ্যানরা যাকে রোমান্টিক করে তোলেন “শিল্পীর যন্ত্রণা” নাম দিয়ে। লেননের জীবনে এই দুটোই ঘটেছিল একসঙ্গে। অবস্য, মা জুলিয়াকে কিশোর বয়সে আবার ফিরে পেয়েছিলেন তিনি, কাছাকাছি থাকতেন। কিন্তু ১৯৫৮ সালে এক মাতাল গাড়িচালকের ধাক্কায় মারা যায় জুলিয়া, লেননের বয়স তখন মাত্র সতেরো।

কোয়ারিম্যান থেকে কিংবদন্তি
১৯৫৭ সালের ৬ জুলাই, উলটনের সেন্ট পিটার্স চার্চের এক গ্রীষ্মমেলায়, ষোলো বছর বয়সী লেনন তাঁর স্কিফল ব্যান্ড “দ্য কোয়ারিম্যান” নিয়ে গান গাইছিলেন। সেদিনই তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা হয় পনেরো বছর বয়সী পল ম্যাকার্টনির। জর্জ হ্যারিসন যোগ দিলেন পরের বছর, স্টুয়ার্ট সাটক্লিফ বেস বাজানো শুরু করলেন ১৯৬০ সালে। কয়েক দফা নাম বদলের পর তাঁরা স্থির করলেন একটি নাম, দ্য বিটলস। হামবুর্গে রেসিডেন্সি, ড্রামার পিট বেস্টের সংযোজন। এভাবেই গড়ে উঠল সেই কাঠামো, যা কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বকে নাড়িয়ে দেবে।
একটা মজার তথ্য দিয়ে এগুনো যাক। যা বিটলম্যানিয়ার চকচকে বিজ্ঞাপনে কখনো প্রকাশ হয়নি। লেনন তখন বিবাহিত ছিলেন। সিনথিয়া পাওয়েলকে বিয়ে করেছিলেন একুশ বছর বয়সে, এবং একটা সন্তানও ছিল তাঁর। ব্যান্ডের ম্যানেজার এই তথ্যটা যথাসম্ভব আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন, কারণ মেয়ে ভক্তরা চাইত তাদের পপ তারকারা হোক চিরকুমার।
“আমরা এখন যিশুর চেয়েও বেশি জনপ্রিয়”
১৯৬৬ সালের মার্চ, লন্ডনের ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় মরিন ক্লিভ নামের এক সাংবাদিক। যিনি বিটলসদের ব্যক্তিগত বন্ধুও ছিলেন। লেননের একটা সাক্ষাৎকার নিলেন। প্রসঙ্গক্রমে নানা কথার মধ্যে লেনন বলে ফেললেন এক বাক্য, যা পরে ইতিহাসের পাতায় তাঁকে তাড়া করে আজীবন। তিনি বললেন, “Christianity will go, It will vanish and shrink….We’re more popular than Jesus now.” “খ্রিস্টধর্ম বিলীন হয়ে যাবে… আমরা এখন যিশুর চেয়েও বেশি জনপ্রিয়।”

ব্রিটেনে এই মন্তব্য কারো ভ্রু কুঁচকায়নি। কিন্তু চার মাস পর, যখন আমেরিকান কিশোরী-পত্রিকা ডেটবুক এই উক্তিটা প্রসঙ্গ থেকে ছিঁড়ে এনে কভারে ছাপাল, তখন আমেরিকার বাইবেল বেল্টে আগুন জ্বলে উঠল। বার্মিংহাম, আলাবামার রেডিও জকিরা ঘোষণা দিলেন বিটলসের রেকর্ড “চিরতরে নিষিদ্ধ”, আর শ্রোতাদের ডাকা হলো তাদের রেকর্ড পুড়িয়ে ফেলার জন্য।
এই বিতর্কই বিটলসের সফর-বিমুখতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তারা আর কখনো সফরে বের হয়নি, আর লেনন একক ক্যারিয়ারেও সফর এড়িয়ে গেছেন।

বিছানায় শুয়ে বিপ্লব
১৯৬৯ সালের মার্চ, বিয়ের পাঁচ দিনের মাথায়। আমস্টারডামের হিলটন হোটেলের এক স্যুটে জন লেনন আর তাঁর নতুন স্ত্রী ইয়োকো ওনো বিছানায় শুয়ে পড়লেন। এবং ছয় দিন সেখান থেকে উঠলেন না। এটা ছিল রাজনৈতিক থিয়েটারের এক অভূতপূর্ব পরীক্ষা, প্রতিবাদ আর পারফরম্যান্স আর্টের সীমারেখা মুছে দেওয়া এক ঘটনা।
দুই মাস পর মন্ট্রিয়লের কুইন এলিজাবেথ হোটেলে দ্বিতীয় বেড-ইন হয়। নিউ ইয়র্কে ঢোকার অনুমতি না পাওয়ায় কানাডায়। এই সপ্তাহব্যাপী আয়োজনে এসে হাজির হলেন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ, মানবাধিকারকর্মী ডিক গ্রেগরি, এলএসডি-প্রবক্তা টিমোথি লিয়ারি, এবং কার্টুনিস্ট আল ক্যাপ। ১ জুন, হোটেলকক্ষে জড়ো হওয়া মানুষদের কোরাস সঙ্গে নিয়ে লেনন রেকর্ড করলেন “গিভ পিস আ চান্স”, যা মুক্তি পায় ৪ জুলাই।
সেই বছরের শেষে, নিউ ইয়র্ক থেকে টোকিও পর্যন্ত বারোটা প্রধান শহরে একটা সাদাকালো বিলবোর্ড টাঙানো হলো, যাতে লেখা, “যুদ্ধ শেষ! যদি তুমি চাও। জন আর ইয়োকোর তরফ থেকে শুভ বড়দিন।”
রাষ্ট্র বনাম একজন গায়ক
একটা দেশের প্রেসিডেন্ট, যাঁর কাছে পারমাণবিক অস্ত্রের চাবি। অথচ সে একজন গিটারিস্টকে নিয়ে রীতিমতো আতঙ্কিত। ১৯৭১ সালে লেনন নিউ ইয়র্কে এসে কট্টরপন্থী যুদ্ধবিরোধী কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরপরই এফবিআই তাঁর ওপর নজরদারি শুরু করে, এবং পরের বছর অভিবাসন বিভাগ তাঁকে দেশ থেকে বের করে দেয়ার চেষ্টা চালায়। ইতিহাসবিদ জন উইনার চৌদ্দ বছর ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে এফবিআই-র কাছ থেকে এই গোপন ফাইলগুলো প্রকাশ করিয়েছিলেন।
১৯৭২ সালের নির্বাচন ছিল প্রথম নির্বাচন, যেখানে ভোটাধিকারের বয়সসীমা একুশ থেকে কমিয়ে আঠারো করা হয়, আর কিছু রাজনীতিবিদ আশঙ্কা করছিলেন এই জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী তরুণ ভোটারদের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন। শুধু আমেরিকা নয়। কানাডার রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশও লেনন আর ওনোর ওপর নজর রাখছিল, যখন তাঁরা টরন্টোর কাছে এক বিশাল শান্তি উৎসবের পরিকল্পনা করেছিলেন।
এফবিআই-র একটা অভ্যন্তরীণ মেমোতে লেননকে নিয়ে একধরনের অবজ্ঞাও প্রকাশ পেয়েছিল। তাঁকে “র্যাডিক্যাল প্রবণতাসম্পন্ন” বলা হলেও “প্রকৃত বিপ্লবী” হিসেবে গণ্য করা হয়নি, কারণ মেমোর ভাষায় তিনি প্রায় সবসময় মাদকের প্রভাবে থাকতেন। এই লড়াই চলেছিল বছরের পর বছর। অবশেষে ১৯৭৬ সালে লেনন গ্রিন কার্ড পান, এবং পরবর্তী চার বছর যুক্তরাষ্ট্রে সুখেই বসবাস করেন।
ইয়োকো, বিশ্ব তাকে ক্ষমা করেনি আজও
বিটলস ভাঙনের পেছনে যত কারণ ইতিহাসবিদরা খুঁজেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে অন্যায্যভাবে অভিযুক্ত একটা নাম, ইয়োকো ওনো। ওনোর তীক্ষ্ণ, কখনো কখনো স্ববিরোধী নির্দেশনাগুলো লেননকে প্রথমে মুগ্ধ করেছিল, আর তারপর প্রভাবিত করেছিল। ১৯৬৮ সালের “ইয়ার ব্লুজ” থেকে শুরু করে তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম প্লাস্টিক ওনো ব্যান্ড (১৯৭০), এমনকি জীবনের শেষ অ্যালবাম ডাবল ফ্যান্টাসি (১৯৮০) পর্যন্ত, এই সবকিছুতেই ফুটে ওঠে ওনোর সেই বিশ্বাস, যে শিল্প হওয়া উচিত কৃত্রিমতাহীন। আর সেই বিখ্যাত গান “ইমাজিন”-এর মূল ধারণার কৃতিত্ব লেনন নিজেই দিয়েছিলেন ইয়োকোকে।
যে রাতে থেমে গেল গান
৮ ডিসেম্বর ১৯৮০। চল্লিশ বছর বয়সী লেনন সেদিন এক ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছিলেন। ফটোশুট, সাক্ষাৎকার, স্টুডিওতে রেকর্ডিং। সেই বিকেলেই, ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মার্ক ডেভিড চ্যাপম্যানের সাথে দেখা হয়েছিল লেননের। সদ্য প্রকাশিত অ্যালবাম Double Fantasy -র একটি কপি চ্যাপম্যানের হাতে দেখে লেনন তাকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কি একটি অটোগ্রাফ চান? চ্যাপম্যান সম্মতি দিলে লেনন তাতে স্বাক্ষর করেন। সেই মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন পল গোরেশ। এরপর রেকর্ডিং স্টুডিওতে গিয়ে জন ও ইয়োকো তাঁদের গান Walking on Thin Ice-এর চূড়ান্ত কাজ শেষ করেন। রাত প্রায় পৌনে এগারোটা। লেনন আর ওনো লিমুজিন থেকে নেমে ডাকোটার দিকে হাঁটছিলেন। নিরাপদ ভেতরের আঙিনার বদলে তাঁরা সেদিন বাইরের ফুটপাত থেকে নেমেছিলেন। কারণ লেননের অভ্যাস ছিল ভক্তদের সঙ্গে কথা বলার। ঠিক সেই সময় অন্ধকার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে চ্যাপম্যান, তারপর তার নামে ডেকে বলে, “মিস্টার লেনন”।

চ্যাপম্যান তার .38 ক্যালিবারের রিভলভার থেকে টানা চারটি গুলি ছোড়ে। দুটি গুলি লেননের পিঠে এবং দুটি কাঁধে লাগে। রাত এগারোটা পনেরো মিনিটে রুজভেল্ট হাসপাতালে লেননকে মৃত ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে, চ্যাপম্যান পালালেন না। সেখানেই দাঁড়িয়ে জে. ডি. স্যালিঞ্জারের দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই বইটা পড়তে শুরু করলেন, যতক্ষণ না পুলিশ এসে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
চ্যাপম্যান নিজেকে দেখতেন হোল্ডেন কলফিল্ডের মতো। যে ভণ্ডামি ঘৃণা করত। চ্যাপম্যানের চোখে লেননও হয়ে উঠেছিলেন এক “ভণ্ড”। চ্যাপম্যানকে ২০ বছর থেকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়, এবং তিনি বারবার প্যারোলের আবেদনে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন।
ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। চ্যাপম্যান নিজেও এক সময় বিটলস-ভক্ত ছিলেন। চ্যাপম্যানের মতে, লেননের প্রতি তার এই ক্রোধের কারণ লেননের সেই বাক্য, যেখানে তিনি বলেছিলেন “We’re more popular than Jesus now.”
যে গান থামেনি, গায়কের মৃত্যুর পরও
লেননের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই ডাকোটার সামনে হাজার মানুষের ভিড় জমে যায়। সাংবাদিক পিট হ্যামিল লিখেছিলেন, এই মৃত্যু যেন তাঁকে এক ধাক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল ষাটের দশকে।
আজ, ছেচল্লিশ বছর পরেও, “ইমাজিন” বাজে অলিম্পিক উদ্বোধনীতে, যুদ্ধবিরতির আলোচনায়, সন্ত্রাসী হামলার পরের রাতে জনসমাবেশে। জন লেননের জীবনের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ বোধহয় এটাই। যে মানুষটা নিজের শৈশবে কখনো নিরাপত্তা, স্থিতি বা শান্তি পাননি, তিনিই হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের কাছে শান্তির সবচেয়ে পরিচিত মুখের একটি।
হয়তো এটাই শিল্পের আসল রহস্য। যে মানুষ নিজে যা পায়নি, সে-ই সবচেয়ে নিখুঁতভাবে আঁকতে পারে তার অনুপস্থিতির আকার। জন লেনন কোনো সাধু ছিলেন না। ছিলেন রাগী, খিটখিটে, কখনো নিষ্ঠুর, প্রায়ই অস্থির এক মানুষ। কিন্তু ঠিক সেই অপূর্ণতার ভেতর থেকেই তিনি তৈরি করেছিলেন এমন এক স্বপ্ন, যা তাঁর নিজের চেয়েও বহুগুণ বড় হয়ে বেঁচে রইল।