মানুষ চিরকাল চেয়েছে দূরত্বকে জয় করতে। পাহাড়ের চূড়ায় আগুন জ্বেলে, পায়রার পায়ে চিঠি বেঁধে, ধুলোপথে ঘোড়া ছুটিয়ে। সভ্যতা যতটুকু এগিয়েছে, তার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে এই যোগাযোগের আকুলতা। সেই আকুলতাকে একটি তামার তারে বন্দী করে যিনি পৃথিবীকে চমকে দিয়েছিলেন, তাঁর নাম স্যামুয়েল ফিনলি ব্রিজ মোর্স। জন্ম ২৭ এপ্রিল, ১৭৯১, ম্যাসাচুসেটসের চার্লসটাউনে, এক কনগ্রিগেশনালিস্ট যাজক জেডিডায়া মোর্সের ঘরে। বাবা ছিলেন কড়া ক্যালভিনিস্ট, ভূগোলবিদ হিসেবেও নামডাক ছিল তাঁর, আর সেই শৃঙ্খলার ছায়াতেই বেড়ে উঠেছিলেন ছেলেটি।
অদ্ভুত এই মানুষটি আসলে ছিলেন একজন চিত্রশিল্পী। ফিলিপস একাডেমিতে পড়াশোনায় তেমন মনোযোগী ছিলেন না, তবু বাবা-মা তাঁকে পাঠালেন ইয়েল কলেজে। সেখানেও পড়াশোনার চেয়ে আঁকার প্রতি টান ছিল বেশি, যদিও বিদ্যুৎ নিয়ে কিছু বক্তৃতা তাঁর মধ্যে একটা কৌতূহলের বীজ বুনে দিয়েছিল, যা বহু বছর পর অঙ্কুরিত হয়। ১৮১০ সালে ইয়েল থেকে পাশ করে তিনি চিত্রকলাকেই পেশা করতে চাইলেন। শিল্পী ওয়াশিংটন অলস্টনের হাত ধরে ১৮১১ সালে পাড়ি দিলেন লন্ডনে, ভর্তি হলেন রয়্যাল একাডেমিতে, রেনেসাঁ ঘরানার প্রভাবে গড়ে তুললেন নিজের ব্রাশের ভাষা। ফিরলেন ১৮১৫ সালে, আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত হলেন এক সফল প্রতিকৃতি-শিল্পী হিসেবে। প্রেসিডেন্ট জন অ্যাডামস আর জেমস মনরোর প্রতিকৃতি আঁকার সুযোগ পেলেন, নিউইয়র্কে গড়ে তুললেন ন্যাশনাল একাডেমি অব ডিজাইন। বুকে স্বপ্ন, হাতে তুলি। কিন্তু ভাগ্য তাঁর জন্য অন্য নকশা বুনছিল।
সেই নকশার শুরুটা এক ভয়াবহ বিয়োগান্তক ঘটনায়। ১৮২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। মোর্স তখন ওয়াশিংটনে, মার্কি দ্য লাফায়েতের প্রতিকৃতি আঁকছেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কমিশনগুলোর একটি। ঠিক তখনই বাড়ি থেকে খবর এল, তাঁর স্ত্রী লুক্রেশিয়া তৃতীয় সন্তান জন্ম দেওয়ার কিছুদিন পরই ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ঘোড়ার গাড়িতে ছুটলেন নিউ হেভেনের দিকে। কিন্তু পথেই এল দ্বিতীয় চিঠি, যেখানে বাবা লিখেছিলেন, তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর আকস্মিক মৃত্যুর কথা। বাড়ি পৌঁছানোর আগেই লুক্রেশিয়াকে সমাহিত করা হয়ে গিয়েছিল। মোর্স আর কখনো স্ত্রীর মুখ দেখতে পাননি। শুধু একটা চিঠি, যা সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াল। বহু বছর পর মেয়ে সুজানকে লিখেছিলেন, এই ক্ষত কতটা গভীর ছিল তা বোঝানো সম্ভব নয়। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই ট্র্যাজেডিই হয়তো মোর্সের মনে প্রথম বীজ বুনেছিল দ্রুত যোগাযোগের এক অদম্য তাড়নার। যে মানুষটি একদিন পৃথিবীর দূরত্ব ঘুচিয়ে দেবেন, তাঁর নিজের জীবনের সবচেয়ে গভীর ক্ষতটাই এসেছিল দূরত্বের কারণে, একটা বিলম্বিত চিঠি থেকে।
একটি ড্যাশ আর একটি ডট
এরপরও বছর সাতেক তিনি চিত্রকলা আঁকড়ে ছিলেন। প্যারিসে গিয়ে লুভরের বিখ্যাত চিত্রকর্মগুলোর ক্ষুদ্রাকৃতি সংস্করণ এঁকে একটি বিশাল ক্যানভাস তৈরি করলেন, যা প্রদর্শনীতে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। তখন তাঁর বয়স সাতচল্লিশ, চুলে পাক ধরেছে, আর্থিক টানাপোড়েন সীমাহীন। ঠিক এই সংকটকালেই, ১৮৩২ সালে ইউরোপ থেকে জাহাজে ফেরার পথে, ডেকের উপর এক আলাপে মোর্সের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায়। সহযাত্রী চার্লস থমাস জ্যাকসনের সঙ্গে তড়িৎচুম্বকত্ব নিয়ে কথা বলতে বলতে তিনি বুঝতে পারলেন, বৈদ্যুতিক স্পন্দনের মাধ্যমে তারের ভেতর দিয়ে বার্তা পাঠানো সম্ভব। সেই রাতেই স্কেচবুকে এঁকে ফেললেন তাঁর স্বপ্নের নকশা।
কিন্তু মোর্স তখন বিদ্যুৎ বা তড়িৎচুম্বকতা সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতেন না। জ্ঞানের এই শূন্যতা পূরণ করলেন পদার্থবিজ্ঞানী লিওনার্ড গেল ও দক্ষ কারিগর আলফ্রেড ভেইল। এই ত্রয়ীর মিলিত পরিশ্রমে ১৮৩৫ সালের মধ্যে তৈরি হলো প্রথম কার্যকর মডেল, আর ১৮৩৮ সালে জন্ম নিল বিশ্বখ্যাত মোর্স কোড। বিন্দু আর দাশের সেই জাদুর ভাষা। ১৮৩৭ সালে তিনি চূড়ান্তভাবে চিত্রকলা ছেড়ে দিলেন, পেটেন্টের আবেদন করলেন এবং পুরোপুরি মনোনিবেশ করলেন এই একটি লক্ষ্যে। ইউরোপে অবশ্য তাঁর ব্যবসায়িক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল, ইংল্যান্ডে ততদিনে উইলিয়াম কুক আর চার্লস হুইটস্টোন নিজেদের মতো একটি টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা দাঁড় করিয়ে ফেলেছেন। তবু মোর্স একা হাল ছাড়েননি, ১৮৪৩ সালে অবশেষে কংগ্রেসের কাছ থেকে অর্থসহায়তা আদায় করলেন ওয়াশিংটন থেকে বাল্টিমোর পর্যন্ত প্রথম টেলিগ্রাফ লাইন বসানোর জন্য।
১৮৪৪ সালের ২৪ মে, ওয়াশিংটন থেকে বাল্টিমোর। প্রায় চল্লিশ মাইল দূরে। মোর্স পাঠালেন তাঁর ঐতিহাসিক প্রথম বার্তা, “What hath God wrought!”, অর্থাৎ “ঈশ্বর কী সৃষ্টি করিয়াছেন!”। বার্তাটি সফল হওয়ার পরপরই শুরু হলো আরেক লড়াই, স্বত্ব নিয়ে মামলা, প্রতিদ্বন্দ্বী উদ্ভাবকদের দাবি, আর তাঁর নিজের অংশীদারদের সঙ্গে বিরোধ। বাবার মতোই তর্কপ্রিয় স্বভাবের মোর্স এসব লড়াইয়ে পিছপা হননি।
শীঘ্রই তারের জাল ছড়িয়ে পড়ল আটলান্টিক উপকূল জুড়ে, তারপর পশ্চিম দিকে, এবং মোর্সের জীবদ্দশাতেই ইউরোপ ও আমেরিকার মহাদেশ দুটি টেলিগ্রাফ দিয়ে যুক্ত হলো। ১৮৫১ সালে ইউরোপের সরকারি যোগাযোগ ব্যবস্থায় মোর্স টেলিগ্রাফ আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হলো। একাধিক দেশের রাজা ও সম্রাটরা তাঁকে পুরস্কারে ভূষিত করলেন। খ্যাতি আর সচ্ছলতা যখন এল, ততদিনে তিনি বিয়ে করেছেন দ্বিতীয়বার, ১৮৪৮ সালে, সারা গ্রিসওল্ডকে, আর তাঁদের সংসারে এল আরও চারটি সন্তান। জীবনের শেষ পর্বে তিনি হয়ে উঠলেন দানশীল এক পৃষ্ঠপোষক, ভাসার কলেজ প্রতিষ্ঠায় অর্থসহায়তা দিলেন, নিজের প্রিয় ইয়েল কলেজেও অনুদান পাঠালেন। তবে এই মানুষটির চরিত্র নিছক সরলরৈখিক ছিল না, রাজনীতিতে তিনি ছিলেন কট্টর অভিবাসন-বিরোধী ও দাসপ্রথার সমর্থক, একাধিকবার নিউইয়র্কের মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও হেরেছিলেন এই বিতর্কিত অবস্থানের কারণে। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখেনি সেসব বিতর্কের জন্য, মনে রেখেছে সেই একটি আবিষ্কারের জন্য যা দূরত্বকে সংকুচিত করেছিল, আর হয়তো সময়ের সাথে সাথে বদলে দিয়েছিল বিদায় বলার পদ্ধতিটাও।
আর তারপর। ২ এপ্রিল ১৮৭২, আশি বছর বয়সে নিউইয়র্কে মৃত্যু হলো এই আশ্চর্য মানুষটির। গ্রিন-উড সেমেট্রিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তুলির বদলে তিনি শেষ পর্যন্ত বেছে নিয়েছিলেন তার। তবু ইতিহাস তাঁকে মনে রেখেছে দুটি পরিচয়েই। একজন শিল্পী, এবং সেই মানুষ যিনি বজ্রপাতকে বশ মানিয়ে তারের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে শিখাইছিলেন, যিনি নিজে এক বিলম্বিত চিঠির নিষ্ঠুরতা সয়ে বুঝেছিলেন, দূরত্ব মানে শুধু মাইলের হিসাব নয়, দূরত্ব মানে কখনো কখনো একটা জীবনভর বহন করা ক্ষতও।