এআই কাজ করবে ভেবেছিলাম, এখন কাজ আরো বেড়ে গেল

এআই কাজ কমানোর কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো

● দ্য পাবলিশ নিউজরুম

আগস্ট ১১, ২০২৬

এআই কাজ করবে ভেবেছিলাম, এখন কাজ আরো বেড়ে গেল The Publish

ইলাস্ট্রেশন : মাহমুদ / দ্য পাবলিশ


চার বছর আগে গুগলের এক ইঞ্জিনিয়ারিং পরিচালক বলেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এতটাই দক্ষ হয়ে উঠবে যে ২০২৫ সালের মধ্যে মানুষ সপ্তাহে চার দিন কাজ করলেই চলবে। সেই ভবিষ্যদ্বাণীর ঠিক এক বছর পর, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে, ওপেনএআই নিজেই এই দাবিতে সিলমোহর বসিয়ে দিল। কোম্পানিটি প্রকাশ্যে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেতন অপরিবর্তিত রেখে সপ্তাহে চার দিনের কর্মদিবস পরীক্ষা করে দেখতে বলল, যুক্তি হিসেবে দাঁড় করাল এই দাবি যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিগগিরই মানুষের শ্রমকে এতটাই দ্রুতগতির করে তুলবে যে করপোরেট দুনিয়ার এখনই প্রস্তুত হওয়া উচিত।

কথাটা শুনতে ভালো। সমস্যা হলো, যারা এই কথা বলছে, তাদের নিজেদের অফিসে বসেই এর উল্টো ছবি দেখা যাচ্ছে। ওপেনএআই থেকে গত বছর চাকরি ছাড়া এক সাবেক প্রযুক্তিকর্মী বিবিসিকে জানিয়েছেন, তিনি যতদিন সেখানে ছিলেন ততদিন কোম্পানিটি নিজে কখনো এই চার দিনের সপ্তাহ পরীক্ষা করে দেখেনি। উল্টো তার বর্ণনায় উঠে এসেছে ঘন ঘন “সংকট বৈঠক”, সপ্তাহান্তে কাজ, আর এমন এক পারফরম্যান্স রিভিউ সংস্কৃতি যেখানে সহকর্মীরা হুট করেই চাকরি হারাতেন। শনি-রোববার অফিসে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, কাজ যেন আটকে না থাকে বা কিছু ভেঙে না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করতেই তাকে ছুটির দিনেও ঢুকতে হতো।

এই একজনই ব্যতিক্রম নন। প্রযুক্তি খাতে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা নতুন কিছু নয়, বিনিয়োগ ব্যাংকিং, আইন কিংবা চিকিৎসা পেশাতেও এমনটা দেখা যায়। কিন্তু সিলিকন ভ্যালির সংস্কৃতিতে চৌদ্দ ঘণ্টার কর্মদিবস কখনো স্বাভাবিক ছিল না, বছরের পর বছর এটা ছিল মূলত নয়টা-পাঁচটার অফিস। সেই সমীকরণ এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। ওই সাবেক ওপেনএআই কর্মী জানিয়েছেন, তিনি সপ্তাহে অন্তত সত্তর ঘণ্টা কাজ করতেন, আগের যেকোনো প্রযুক্তি চাকরির তুলনায় যা ছিল অনেক বেশি। এখন তিনি অন্য একটি এআই-কেন্দ্রিক স্টার্টআপে কাজ করেন, আর সেখানে জীবনযাত্রার ভারসাম্য কিছুটা ভালো, “স্প্রিন্ট” ছাড়া সময়ে সপ্তাহে পঞ্চাশ থেকে ষাট ঘণ্টা।

“স্প্রিন্ট” শব্দটা প্রযুক্তি খাতে পুরনো, নতুন কোনো ফিচার বা পণ্য বাজারে ছাড়ার আগের কয়েক সপ্তাহে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সময়কালকে বোঝাতে এটা ব্যবহার হয়। কিন্তু এআই কোম্পানিগুলোতে, আর বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এআই প্রকল্পগুলোতে এই স্প্রিন্ট এখন চরম রূপ নিয়েছে। বিবিসির সঙ্গে কথা বলা প্রযুক্তিকর্মীদের মতে, ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকে এই স্প্রিন্ট কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে, এক সপ্তাহে নব্বই ঘণ্টা কাজের সীমা ছাড়িয়ে যায়। দুই কোম্পানির কেউই এই প্রতিবেদনের ব্যাপারে বিবিসির অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

অ্যানথ্রপিক নিজেই গর্বের সঙ্গে বলে বেড়ায়, তাদের চ্যাটবট ও কোডিং টুল ক্লদ একটানা সাত ঘণ্টা, অর্থাৎ প্রায় একটা পুরো করপোরেট কর্মদিবসের সমান সময়, বিরতি ছাড়াই কাজ করতে পারে। মেটার মার্ক জাকারবার্গ বলেছেন, চলতি বছরটাই সেই সময় যখন এআই তাদের কাজের পদ্ধতিকে নাটকীয়ভাবে বদলে দিচ্ছে, এমন সব টুল যা আগের চেয়ে অনেক কম কর্মী দিয়ে অনেক বেশি কাজ করানো সম্ভব করে তুলছে। অথচ মেটা এরই মধ্যে তাদের মোট কর্মীর দশ ভাগের এক ভাগ ছাঁটাই করেছে, আর অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই সতর্ক করেছেন, এআই যত বেশি উৎপাদনশীল হবে, চাকরি হারানোর মাত্রা তত বাড়তে পারে।

এই বৈপরীত্যটাই আসল গল্প। যে কোম্পানিগুলো নিজেরাই এআই বানাচ্ছে, আর নিজেদের কর্মীদের সেই টুল দিয়ে কাজও করাচ্ছে যেগুলো নাকি মানুষের কাজের কিছু অংশ করে দেওয়ার কথা, সেই কোম্পানিগুলোর ভেতরের মানুষরাই বলছেন তারা সপ্তাহে পাঁচ দিন চল্লিশ ঘণ্টার চেয়ে ঢের বেশি সময় কাজ করছেন।

মেটায় এই বছর কর্মীদের হঠাৎ করেই নতুন দলে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যেসব এআই প্রকল্পকে জরুরি হিসেবে ধরা হচ্ছে তাতে। এক বর্তমান আর এক সাবেক কর্মীর ভাষায়, এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় “ড্রাফটেড হওয়া”, কারণ কর্মীদের কোনো বাছাইয়ের সুযোগ দেওয়া হয় না। সাবেক কর্মীটির ভাষ্যে, কোনো এক পর্যায়ে আপনাকে কেবল সরিয়ে নেওয়া হয়, না বললে চাকরি ছাড়তে হয়। মেটা সম্প্রতি এই কঠোর নীতি কিছুটা শিথিল করেছে বলে জানানো হলেও, ততদিনে অনেক কর্মীকে এই কাজে ঠেলে দেওয়া হয়ে গেছে।

এসব দলে কর্মঘণ্টা প্রায়ই দীর্ঘ, গভীর রাত পর্যন্ত কাজ, সপ্তাহান্তে কাজ, আর যে সময়টায় সরাসরি কাজ চলছে না তখনও নিজেদের “অন কল” মনে করার অনুভূতি নিয়ে থাকতে হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। যুক্তরাষ্ট্রে ষোলো বছরের বেশি বয়সী কারও সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টার কোনো আইনি সীমা নেই, যেখানে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে ওভারটাইমসহ সপ্তাহে আটচল্লিশ ঘণ্টার সীমা বেঁধে দেওয়া আইন আছে। মেটার বর্তমান এআই প্রকল্পের মধ্যে আছে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ করতে পারে এমন একটি টুল তৈরি, আর এমন এক মডেল অবকাঠামো বানানো যা দিয়ে মাপা যাবে এআই কতটা সফলভাবে মানুষের নানা কাজ নকল করতে পারছে। সাবেক ওই কর্মীর কথায়, এই কাজটা আক্ষরিক অর্থেই মানুষের কাজকে নকল করার চেষ্টায় নিয়োজিত একটা দলের সঙ্গে কাজ করার মতো, আর তার ভাষায় এই কাজের যেন কোনো শেষ নেই।

এআই তৈরির সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন এমন প্রযুক্তিকর্মীরাও এই প্রযুক্তির কারণে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার মুখে পড়ছেন। গুগলের সাবেক কর্মী আমিন শালি মে মাসে চাকরি ছেড়ে দেন, কারণ তার দাবি অনুযায়ী এআই তার কাজকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছিল। রাতের পর রাত তাকে কাজ করতে হতো, কারণ প্রসেসিং ইউনিট আর মেমোরি স্টোরেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ক্রমেই এআই প্রকল্পের দিকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল, ফলে অভ্যন্তরীণ ইঞ্জিনিয়ারিং সিস্টেম প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ত। গুগল এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। চাকরি ছাড়ার পর থেকে শালির ঘুম আর সার্বিক স্বাস্থ্য উন্নত হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তার বিশ্লেষণে, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রকৌশলীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে এমন এক সংস্কৃতির জন্ম দেয় যা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়।

এখানেই প্রশ্নটা জোরালো হয়ে ওঠে, সময় বাঁচানোর কথা তাহলে গেল কোথায়। কিছু নতুন গবেষণা বলছে, এআই আসলে কর্মীদের কাজের চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রযুক্তি কোম্পানির কয়েকশ কর্মীকে আট মাস ধরে অনুসরণ করে করা ইউসি বার্কলির একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহারকারীরা আগের চেয়ে দ্রুতগতিতে কাজ করেছেন, বেশি ধরনের কাজের দায়িত্ব নিয়েছেন, আর দিনের আরও বেশি সময় জুড়ে কাজ ছড়িয়ে দিয়েছেন। এমআইটির উদ্ভাবন বিশেষজ্ঞ নীল টমসনের বিশ্লেষণে, এমনকি এআই উন্নয়নে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কর্মীদের কেবল টুল ব্যবহার করে বাকি সময়টা ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় না, এমন সম্ভাবনা কম।

টমসনের ভাষ্যে, বাস্তবে সময় বাঁচলেও সেই বাঁচতি সময়টা শুষে নেয় নতুন পরিবর্তন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া, আর সেগুলো ঠিকঠাক কাজ করছে কি না তা নিশ্চিত করার তাগিদ। ইউসি বার্কলির গবেষণায় আরেকটি কারণ উঠে এসেছে, এআই টুলের আউটপুট ক্রমাগত যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা কর্মীদের কাজের পরিধি বাড়িয়ে দিয়েছে। কোনো কর্মী যদি এআই টুলের জন্য প্রক্রিয়াগুলো মসৃণ করে ফেলেন, তাহলে বাঁচা সময়টাও মানুষ নতুন কাজ দিয়ে ভরিয়ে ফেলার প্রবণতা দেখায়, হয় নিজের ইচ্ছায়, নয়তো নিয়োগকর্তার কাছে নিজের মূল্য প্রমাণ করার তাগিদে। টমসনের সংক্ষিপ্ত পর্যবেক্ষণ হলো, মানুষ ধরে নেয় বিশ শতাংশ কম কাজ মানেই চার দিনের সপ্তাহ, কিন্তু বাস্তবে নতুন কাজ এসেই সেই ফাঁকটা ভরিয়ে দেয়।

শালির প্রশ্নটাই বোধহয় গোটা কাহিনীর সারাংশ। এআই যদি সত্যিই এত কিছু করে দেওয়ার কথা, তাহলে অন্তত আরও বেশি মানুষের ঘুম আর স্বাস্থ্য ভালো হওয়ার কথা ছিল। বাস্তবে হচ্ছে ঠিক তার উল্টোটা।

যে শিল্প নিজেকে মানুষের শ্রম হালকা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিক্রি করে, সেই শিল্পের ভেতরের মানুষগুলোই এখন সবচেয়ে বেশি সময় অফিসে কাটাচ্ছেন, এই ছবিটা কাকতালীয় নয়। প্রযুক্তির ইতিহাসে উৎপাদনশীলতা বাড়লে কর্মঘণ্টা কমার নজির যতটা আছে, ততটাই আছে বাড়তি উৎপাদনশীলতাকে আরও বেশি প্রত্যাশার জোয়ালে বেঁধে ফেলার নজির। এআই যুগে সেই পুরনো সমীকরণটাই যেন নতুন মোড়কে ফিরে আসছে, শুধু এবার প্রতিশ্রুতিটা আরও জোরালো, আর বাস্তবতাটা আরও দীর্ঘ কর্মঘণ্টার। ●

এই আর্টিকেলের তথ্য বিবিসি’র সাম্প্রতিক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে নেয়া।


Picture of দ্য পাবলিশ নিউজরুম

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

শেয়ার

আরও পড়েন

দুর্গের ভেতরে কয়েক হাজার সৈন্য, বাইরে প্রায় লক্ষাধিক উসমানীয় সেনা। এই লড়াই চলেছিল এক মাস, আর দুর্গ পতনের আগেই শেষ অভিযানে মৃত্যুবরণ করেন সুলতান সুলেমান।

দ্য পাবলিশ

উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁর সিনেমায় ফিরে যাওয়ার জন্য এই দশটি ছবি একটি ভালো শুরু।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

ছবিটি দেখে পাবলো পিকাসো বলেন “চার্চিল চাইলে পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারতেন, যদি না তাঁর সময় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকত”।

কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

যখন একটা গেমের পেছনে এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, তখন ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে।

দ্য পাবলিশ নিউজরুম

Scroll to Top