এআই সবই পারলে মানুষের কী শেখা দরকার

এআই মনে রাখা, বোঝা আর প্রয়োগ করার কাজ মানুষের চেয়ে ভালো পারে, এমনকি বিশ্লেষণেও অনেকটা দক্ষ।

● দ্য পাবলিশ নিউজরুম

আগস্ট ১৮, ২০২৬

এআই সবই পারলে মানুষের কী শেখা দরকার The Publish

ইলাস্ট্রেশন : মাহমুদ / দ্য পাবলিশ / ছবি : পা. ডো.


কথাটা শুরু হয় একটা ছোট্ট প্রত্যাখ্যান দিয়ে। এস্তোনিয়ার শিক্ষা ও গবেষণামন্ত্রী ক্রিস্টিনা কালাস টেডএক্স টকের মঞ্চে উঠে প্রথমেই বলেন, তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কথা বলবেন না। কথা বলবেন মানুষ নিয়ে।

ক্রিস্টিনা মন্ত্রী হন ২০২৩ সালের এপ্রিলে। তার পাঁচ মাস আগে, ২০২২-এর নভেম্বরে, বাজারে আসে চ্যাটজিপিটি। তখনও কেউ জানত না এটা কতটা কী বদলে দেবে। ক্রিস্টিনা বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর উপদেষ্টা এসে জানান, এআই নিয়ে কিছু একটা করা দরকার। কী করা দরকার, সে প্রশ্নের উত্তর তখনও কারও কাছে ছিল না। দুই মাস পর উপদেষ্টা আবার আসেন, এবার আরেকটু জরুরি সুরে: স্কুলের ছাত্ররা ইতিমধ্যেই এআই ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। মন্ত্রণালয় তখন ছোটে স্নায়ুবিজ্ঞানী, বোধবিজ্ঞানী আর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে।

এই আলোচনা থেকে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছান ক্রিস্টিনা, প্রযুক্তি তাঁর দুশ্চিন্তার বিষয় না। এআই কীভাবে কাজ করে, সেটা অন্য শাস্ত্রের প্রশ্ন। শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে তাঁর ভাবনার কেন্দ্রে থাকা উচিত শেখা। মানুষের মস্তিষ্কের শেখার সামর্থ্যের কী হবে, যখন প্রযুক্তি এতটা এগিয়ে গেছে।

প্রশ্নটা নতুন না

    প্রশ্নটা যতটা তাৎক্ষণিক শোনায়, ততটা নতুন না আসলে। ২০১৭ সালে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি)-র একটি জরিপে দেখা যায়, সদস্য দেশগুলোর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কর্মীর সাক্ষরতা, সংখ্যাজ্ঞান আর ডিজিটাল সমস্যা-সমাধানের দক্ষতা তখনকার কম্পিউটারের সমপর্যায়ের বা তার চেয়েও কম ছিল। অর্থাৎ, যন্ত্রের সঙ্গে মানুষের বোধশক্তির তুলনা কোনো নতুন উদ্বেগ না। চ্যাটজিপিটি আসারও অনেক আগে থেকে এই তুলনা চলছিল। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, যদি যন্ত্র মানুষের চেয়ে ভালো পড়তে, গুনতে, বিশ্লেষণ করতে পারে, তাহলে মানুষের শেখার দরকারটা কী? শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্যই বা তখন কী থাকে?

    ক্রিস্টিনা আর তাঁর মন্ত্রণালয় প্রায় এক বছর ধরে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন। শেষে যে উপলব্ধিতে তাঁরা পৌঁছান তা হলো, মানব ইতিহাসে এই প্রথম প্রযুক্তি মানুষের বোধশক্তিকে বিবর্তনের চাপে ফেলছে না। ছাপাখানার আবিষ্কারের সময়ও এমন হয়েছিল। ছাপাখানা আসার আগে সাক্ষরতা ছিল সীমিত কিছু মানুষের সুবিধা। ছাপাখানা এসে গোটা মানবজাতিকে বাধ্য করেছিল পড়তে শেখার, এবং মানুষ শিখেছিল। ক্রিস্টিনাের মতে, মানবজাতি আবার একটা বড় বিবর্তনীয় চাপের মুখে দাঁড়িয়ে। তবে এবার চাপটা শারীরিক না, বৌদ্ধিক। দ্রুত, পদ্ধতিগত আর সৃজনশীলভাবে চিন্তা করার সক্ষমতাই এখন মস্তিষ্কের নতুন বিবর্তনের চাপ।

    মস্তিষ্কের দুই গতি

      ক্রিস্টিনা তাঁর যুক্তি সাজান মস্তিষ্কের কার্যপদ্ধতির একটা সরল ব্যাখ্যা দিয়ে। মস্তিষ্ক দুই ধরনের কাজ করে। একটা হলো নিম্ন-স্তরের বোধপ্রক্রিয়া। অর্থাৎ স্মৃতি, বোঝা, আর সয়ংক্রিয়ভাবে রপ্ত করা দক্ষতা। সাইকেল চালানো শিখে ফেললে সেটা আর নতুন করে শিখতে হয় না; মস্তিষ্ক সেই দক্ষতা আত্মস্থ করে নেয় এবং প্রতিবার তা পুনরাবৃত্তি করে। মানুষের স্টেরিওটাইপও এই নিম্ন-স্তরের প্রক্রিয়া থেকেই আসে।

      অন্যদিকে আছে উচ্চ-স্তরের বোধপ্রক্রিয়া। অর্থাৎ বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন, সৃষ্টি। এখানে মস্তিষ্ককে প্রতিবার নতুন করে শিখতে হয়, পুরোনো জ্ঞানকে নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে হয়। মস্তিষ্ক শরীরের সবচেয়ে বেশি শক্তি খরচ করা অঙ্গ, আর উচ্চ-স্তরের চিন্তা সবচেয়ে বেশি শক্তি টানে। তাই মস্তিষ্ক স্বভাবতই নিম্ন-স্তরের, কম-শক্তি-খরচের প্রক্রিয়ায় থাকতে পছন্দ করে। কঠিন পরীক্ষার আগের রাতে পড়াশোনা করলে যে ক্লান্তি লাগে, সেটা ম্যারাথন দৌড়ানোর চেয়েও বেশি নিঃশেষ করে দেয়, কারণ মস্তিষ্ক তখন একটানা উচ্চ-স্তরে কাজ করছিল।

      শিক্ষার সঙ্গে এই কাঠামোর মিল আছে ব্লুমের ট্যাক্সোনমি-তে (Bloom’s Taxonomy), শিক্ষাবিজ্ঞানের একটি সুপরিচিত স্তরবিন্যাস, যেখানে মনে রাখা, বোঝা আর প্রয়োগ করাকে ধরা হয় নিম্ন-স্তরের দক্ষতা, আর বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন ও সৃষ্টিকে ধরা হয় উচ্চ-স্তরের। ক্রিস্টিনাের যুক্তি হলো, গত দুই শতকের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত নিম্ন-স্তরেই আটকে ছিল। মুখস্থ করো, বোঝো, প্রয়োগ করো, পরীক্ষা দাও। উচ্চ-স্তরের বিশ্লেষণ আর মূল্যায়নের চর্চা সাধারণত শুরু হতো শুধু গবেষণা বা পিএইচডি পর্যায়ে গিয়ে।

      এখানেই এআই একটা বাস্তব বিভাজনরেখা টানে। এআই মনে রাখা, বোঝা আর প্রয়োগ করার কাজ মানুষের চেয়ে ভালো পারে, এমনকি বিশ্লেষণেও অনেকটা দক্ষ। কিন্তু নৈতিক মূল্যায়ন আর প্রকৃত সৃষ্টিতে, পরিসংখ্যানগত সম্ভাবনার বাইরে গিয়ে সত্যিকারের নতুন কিছু তৈরিতে মানুষের মস্তিষ্ক এখনও অনন্য। তাই, শিক্ষাব্যবস্থাকে আর মুখস্থ-বোঝা-প্রয়োগেই থেমে থাকলে চলবে না। বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন আর সৃষ্টিকে শেখার কেন্দ্রে আনতে হবে। আর সেটা শুরু করতে হবে স্কুল থেকেই, ১২-১৩ বছর বয়স থেকে।

      এআই লিপ

        এই দর্শনকে বাস্তবে রূপ দিতে এস্তোনিয়া চালু করে “এআই লিপ” (AI Leap) কর্মসূচি। ২০২৪ সালের মধ্যেই মন্ত্রণালয় স্কুলের জন্য একটা এআই কৌশল তৈরি করে ফেলে। প্রেসিডেন্ট আলার কারিস ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে উদ্যোগটি প্রথম প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন। ছাত্রছাত্রীদের হাতে কর্মসূচি পৌঁছায় সেই বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে, শুরুতে দশম ও একাদশ শ্রেণির প্রায় বিশ হাজার শিক্ষার্থী এবং তিন হাজার শিক্ষক এর আওতায় আসেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়ে বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও পৌঁছাবে, যুক্ত হবেন আরও প্রায় আটত্রিশ হাজার শিক্ষার্থী। কর্মসূচিটি সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারত্বে চলছে। বাজেটের অর্ধেক আসে বেসরকারি খাত থেকে, বাকিটা মন্ত্রণালয় থেকে। বাস্তবায়নের দায়িত্ব মন্ত্রণালয়ের হাতে না রেখে দেওয়া হয়েছে একটি স্বতন্ত্র ফাউন্ডেশনের হাতে। ক্রিস্টিনার মতে, উদ্ভাবনী এমন উদ্যোগের জন্য মন্ত্রণালয় সবসময় সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা না।

        কর্মসূচির কেন্দ্রে আছেন শিক্ষকরা। লক্ষ্য প্রযুক্তি না, বরঞ্চ শিক্ষকরা কীভাবে এআই ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণাত্মক ও পদ্ধতিগত চিন্তায় ঠেলে দিতে পারেন। এর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে একধরনের “সক্রেটিক” পদ্ধতির এআই টিউটর। সাধারণ চ্যাটজিপিটির মতো সরাসরি উত্তর দেওয়া টুল না। উল্টো, প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন করে শিক্ষার্থীকে নিজে থেকে ভাবতে বাধ্য করার মতো একটি সংস্করণ, যেটি তৈরি হয়েছে ওপেনএআই-র সঙ্গে যৌথভাবে।

        এস্তোনিয়াই প্রথম এবং এখনো একমাত্র দেশ, যারা শিক্ষার্থীদের হাতে এ ধরনের সক্রেটিক টুল তুলে দিয়েছে। কর্মসূচির ফল নিয়ে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ চলছে। ক্রিস্টিনা বলেন, নিশ্চিত উত্তর এখনো কারও কাছে নেই। এআই মানুষের শেখাকে ঠিক কীভাবে বদলে দিচ্ছে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানও এখনো হাঁটছে অনেকটা অন্ধকারে হাতড়ে। এস্তোনিয়ার সবচেয়ে বড় ভয় ছিল উল্টো দিকে। কিছু না করলে, শিক্ষাব্যবস্থা জড়তার বশে শুধু নিম্ন-স্তরের বোধপ্রক্রিয়াতেই আটকে থাকত, আর জন্ম নিত এক ধরনের সামষ্টিক বৌদ্ধিক আলস্য। কর্মসূচি চালুর সময় এস্তোনিয়ার প্রেসিডেন্ট একটা কথা বলেছিলেন, এআই কতটা সময় ধরে ব্যবহার করা হলো, সেটা বিষয় নয়। বিষয় হলো, কীভাবে এবং কেন ব্যবহার করা হচ্ছে।


        Picture of দ্য পাবলিশ নিউজরুম

        দ্য পাবলিশ নিউজরুম

        শেয়ার

        আরও পড়েন

        দুর্গের ভেতরে কয়েক হাজার সৈন্য, বাইরে প্রায় লক্ষাধিক উসমানীয় সেনা। এই লড়াই চলেছিল এক মাস, আর দুর্গ পতনের আগেই শেষ অভিযানে মৃত্যুবরণ করেন সুলতান সুলেমান।

        দ্য পাবলিশ

        উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষে তাঁর সিনেমায় ফিরে যাওয়ার জন্য এই দশটি ছবি একটি ভালো শুরু।

        দ্য পাবলিশ নিউজরুম

        ছবিটি দেখে পাবলো পিকাসো বলেন “চার্চিল চাইলে পেশাদার চিত্রশিল্পী হতে পারতেন, যদি না তাঁর সময় অন্য কাজে ব্যস্ত থাকত”।

        কালচারাল করেসপন্ডেন্ট

        যখন একটা গেমের পেছনে এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, তখন ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ প্রায় থাকে না বললেই চলে।

        দ্য পাবলিশ নিউজরুম

        Scroll to Top